পোস্টটি পড়া হয়েছে 40,204 বার
qurbani masala

ঈদুল আযহা ও কুরবানিঃ ফজিলত, আমল ও মাসআলা

মুসলিম বিশ্বের দুটি খুশির দিনের একটি হচ্ছে ঈদুল আযহার দিন। এই দিনের অন্যতম বড় ইবাদত হচ্ছে কুরবানি করা। একমাত্র আল্লাহর খুশির জন্য নিজের পছন্দের বা ক্রয়কৃত পশু কুরবানি করা হয়ে থাকে এই দিনে। কুরবানি যেহেতু বছরে একবার আসে তাই এর বিভিন্ন বিধি-বিধান ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। এই লেখায় কুরবানি সংক্রান্ত সহিহ কিছু তথ্য থাকবে। একই সাথে থাকবে বেশ কিছু ভুল ধারণা ও বর্জনীয় কাজের বর্ণনা। আর শুরুতেই সংক্ষেপে আলোচনা করব খুবই ফজিলতপূর্ণ জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের কিছু আমল নিয়ে।

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের করণীয় কাজ বা আমল

রমজানের শেষ ১০ দিনের পর জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দের।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল আল্লাহর কাছে যতটা প্রিয় তা অন্য কোনো সময়ে নয়। সাহাবারা প্রশ্ন করেন, আল্লাহর পথের জেহাদ থেকেও প্রিয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তবে কোনো ব্যক্তি যদি জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে বের হয়ে আর ফিরে না আসে তার কথা ভিন্ন।’ (সহিহ বুখারি)

শায়খ আহমাদুল্লাহর ইউটিউব লেকচারের আলোকে নিচে এই দশ দিনের ১০ টি আমলের উল্লেখ করা হলো।

    • সুন্নাহ অনুসরণ করে আল্লাহর যিকির বা স্মরণ করা। সকল কাজের মাসনূন দুয়া বা বিসমিল্লাহ বলাও আল্লাহর যিকিরের অন্তর্ভুক্ত
    • বেশি বেশি নেক আমল করা (কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, দান-সদকা ইত্যাদি)
    • গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
    • হজ্জ করা (যাদের উপর হজ্জ ফরজ)
    • কুরবানি আদায় করা (যাদের সামর্থ্য আছে)
  • যারা কুরবানির নিয়ত করেছে তাদের জন্য ঈদের দিন পশু কুরবানির আগে চুল-নখ ও অন্যান্য পশম না কাটা
  • এই পুরো ১০ দিনই বেশি বেশি তাকবির-তাহমিদ-তাহলিল পাঠ করা (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ)। চলতে ফিরতে বা অবসর সময়ে পুরুষের জন্য সম্ভব হলে উচ্চস্বরে আর নারীরা নিচু স্বরে এটা পাঠ করবে
  • আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলোর (৯ জিলহজ্জ থেকে ১৩ জিলহজ্জ) ফরজ নামাজের পর অন্তত একবার উপরে বর্ণিত তাকবির-তাহমিদ-তাহলিল পাঠ করা
  • আরাফার দিন রোজা রাখা। এদিন রোজা রাখলে আগের ও পরের এক বছরের গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন। হাদীসে বলা হয়েছে “আরাফার দিন” রোজা রাখার জন্য। হজ্জের সময় আরাফায় উপস্থিত থাকতে হয় ৯ জিলহজ্জ। ৯ জিলহজ্জ রোজা রাখলে আমরা কি বাংলাদেশের চাঁদ দেখে ৯ জিলহজ্জ রাখব নাকি মক্কার সাথে মিলিয়ে আরাফার দিন রাখব? উভয়টার পক্ষেই মত পাওয়া যায়। যেহেতু জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন নেক আমলের সওয়াব অনেক বেশি, তাই কনফিউশন না রেখে আমাদের দেশের চাঁদ অনুযায়ী ৮ ও ৯ জিলহজ্জ উভয় দিনই রোজা রাখার পরামর্শ দেন অনেক আলেম। তাতে হাজীদের আরাফায় অবস্থানের দিন এবং আমাদের দেশের হিসাবে ৯ জিলহজ্জ রোজা রাখা দুইটাই হয়
  • ঈদের দিন ঈদের নামাজ পড়া ও ঈদের অন্যান্য সুন্নাহের উপর আমল করা

রমজানে আমাদের জীবনে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসে। আমরা অন্যান্য সময়ের তুলনায় আরো বেশি আল্লাহমুখী হই। কিন্তু সেই তুলনায় জিলহাজ্জের এই ফজিলতপূর্ণ সময়ের ব্যাপারে আমরা গাফেল থাকি। জিলহজ্জ মাস আসলেই আমরা কুরবানি নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে অন্য কোনো দিকে খেয়াল থাকে না। আসুন এই ১০ দিন আমরা ইবাদতের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেই।

কুরবানি কার উপর ওয়াজিব

কুরবানি ঈদের প্রথম দিন, অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে জিলহজ্জ মাসের ১২ তারিখ সূর্যাস্তের মধ্যে কেউ যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারি হয় তাহলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। নিসাবের পরিমাণ সম্পদের হিসাব হচ্ছে প্রয়োজনীয় অর্থ সম্পদের বাইরে অতিরিক্ত সম্পদের মূল্যমান ৫২ থেকে ৫৫ হাজার টাকার মধ্যে হওয়া। টাকার এই পরিমাণটা উল্লেখ করেছি দেশের বর্তমান সময়ে (২০১৮ সাল) সাড়ে ৫২ ভরি রূপার মূল্যের সাথে মিলিয়ে।

আমরা অনেকেই মনে করি নিসাব হয় শুধু সোনা-রূপা থাকলে। আসলে তা না। নিসাবের হিসাব হয় সোনা, রূপা, ক্যাশ টাকা ও জমিজমার উপর ভিত্তি করে। আপনার নিসাব পরিমান সম্পদ আছে কিনা সেটা হিসাব করতে পারেন এভাবেঃ

  1. আপনার মালিকানায় থাকা স্বর্ণের বর্তমান বিক্রয়মূল্য (স্বর্ণ বিক্রি করতে গেলে এখন যত টাকা পাবেন)
  2. আপনার মালিকানায় থাকা রূপার বর্তমান বিক্রয়মূল্য
  3. আপনার সাথে থাকা দৈনন্দিন খরচের অতিরিক্ত ক্যাশ টাকা, ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি
  4. আপনার বসবাসের বাড়ি ছাড়া (যেখানে আপনি থাকেন না) অন্যান্য ফ্ল্যাট-বাড়ি-দোকান যেগুলো ভাড়া দেয়া আছে সেই ভাড়ার পরিমাণ
  5. এছাড়াও অন্যান্য সম্পদ যেগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য্য নয় বরং সম্পদ হিসাবে আমরা জমা করি সেগুলোর বিক্রয়মূল্য

এইরকম সবগুলোর মূল্য যোগ করে যদি ৫২-৫৫ হাজার টাকার মত পাওয়া যায় তাহলেই ধরে নিতে হবে আপনি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক। যদি আপনার মোটেও স্বর্ণ না থাকে কিন্তু দুইটা ফ্ল্যাট আছে। একটায় থাকেন আরেকটা ভাড়া দেন। তাহলে ঐ ভাড়া দেয়া ফ্ল্যাটের দাম ৫২-৫৫ হাজারের মত হলেই আপনি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক বলে সাব্যস্ত হবেন।

যদি জিলহজ্জের ১০ তারিখ সূর্যোদয় থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের মধ্যের এই সময়ে আমার কাছে খাওয়া-দাওয়া, পোষাক-পরিচ্ছদ, প্রয়োজনীয় বাড়ি-ঘর ইত্যাদির বাইরে উদ্বৃত্ত সম্পদের পরিমাণ (সাড়ে ৫২ ভরি রূপার মূল্য অনুযায়ী) ৫২-৫৫ হাজার টাকার মত হয় তাহলে আমার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। উল্লেখ্য যে, যাকাতের মত কুরবানি ওয়াজিব হবার জন্য এই অতিরিক্ত সম্পদটা আমার হাতে ১ বছর গচ্ছিত থাকা শর্ত নয়। উক্ত ৩ দিনের যে কোন সময় অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হলেই তার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।  রূপার দাম নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। যেমন নতুন রূপা কিনতে গেলে প্রতি ভরি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় পাওয়া যায়। পুরাতন রূপা পাওয়া যায় ৪০০-৪৫০ টাকা ভরি। আলেমগণ বলেন নিসাবের হিসাব তেমনই করা উচিত যাতে গরীবরা উপকৃত হয়। পুরাতন রূপার হিসাবে নিসাবের পরিমান দাঁড়ায় ২৫-৩০ হাজার টাকার মত। আমাদের তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতির উপর নির্ভর করে, আমরা কোনটিকে নিসাব হিসাবে গন্য করব।

এক পরিবারে একাধিক ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব হলে তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ কুরবানি আদায় করতে হবে। সবার পক্ষ থেকে একজন কুরবানি আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হবে না। যৌথ পরিবার হলে বাবার সাথে অন্যান্য ছেলেরাও যদি সামর্থ্যবান হয় তাহলে শুধু বাবা কুরবানি করলে ছেলেদের কুরবানি আদায় হবে না। ছেলেদেরকেও আলাদা ভাবে কুরবানি করতে হবে। আবার ছেলের সংসারে থাকা বাবা-মা যদি সম্পদশালী না হন তাহলে বাবা-মায়ের উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না। ছেলে সম্পদশালী হলে ছেলের উপর ওয়াজিব হবে। স্বামী ও স্ত্রী যদি আলাদা আলাদা ভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হন তাহলে উভয়ের উপর আলাদা আলাদা কুরবানি ওয়াজিব হবে। স্বামী কুরবানি দিলে স্ত্রীর আদায় হবে না। বা স্ত্রী কুরবানি দিলে স্বামীর আদায় হবে না। যদি স্ত্রীর নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ বা অন্যান্য সম্পদ থাকে কিন্তু কুরবানি দেয়ার মত ক্যাশ টাকা না থাকে তাহলেও স্ত্রীর উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। স্বামী যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি করেন তাহলে স্ত্রীর কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু স্বামী যদি তা দিতে অপারগ হন বা না দেন তাহলে যেভাবেই হোক স্ত্রীকে কুরবানি আদায় করতে হবে। প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে হলেও কুরবানি দিতে হবে। অন্যথায় ওয়াজিব আদায় না করার জন্য কঠিনতম গুনাহের ভাগীদার হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্ত্রীর উপর কুরবানি ওয়াজিব হলে স্বামীর উপর সেটা আদায় করা বা স্ত্রীকে কুরবানির টাকা দেয়া স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক নয়। স্বামী যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি দিয়ে দেয় তাহলে ভাল, কিন্তু না দিলে তার কোনো গুনাহ হবে না। আমাদের দেশে আমরা কথার কথা বলি টাকা পয়সা যা আছে সবই তো স্বামী-স্ত্রী দুইজনেরই! দুইজন আর আলাদা কী? ইসলাম তা বলে না। ইসলাম স্বামী ও স্ত্রীর আলাদা সম্পদের মালিকানার কথা বলে। তাই নামাজ-রোজার মত যাকাত, কুরবানি, হজ্জও সম্পদ থাকা সাপেক্ষে স্বামী-স্ত্রীর উপর আলাদা আলাদা ভাবে ফরজ হয়।

যিনি কুরবানি করবেন তিনি তার পরিবারের সকলের পক্ষ থেকে কুরবানি করবেন। অর্থাৎ পরিবারের ছোট-বড় বাকি যারা আছে কুরবানি করতে পারে নাই তাদেরকেও শুধু নিয়তে মাধ্যমে কুরবানিতে সামিল করা যাবে। যেমন পরিবারের বাবা শুধু সম্পদশালী হলে (স্ত্রী সন্তানদের নিসাব পরিমান সম্পদ না থাকলে) তিনি কুরবানি করবেন তার স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে। বাবার এই নিয়তের কারণে এই কুরবানিতে স্ত্রী-সন্তানেরাও সওয়াবের ভাগিদার হবে। একই ভাবে মৃত আত্মীয়স্বজনদের কথা নিয়তের মধ্যে এনেও তাদেরকে কুরবানির সওয়াবের অংশীদার করা যাবে। অনেক আলেম মৃত ব্যক্তির নামে আলাদা করে কুরবানি করাকে জায়েজ বলেছেন। আবার অনেক আলেম বলেছেন এটা সুন্নাহ পরিপন্থি কাজ। তাদের মতে যদি কোনো মৃত ব্যক্তির সওয়াবের জন্য আলাদা কুরবানি দেয়া হয় তাহলে ঐ কুরবানির সমস্ত গোশত দান করে দিতে হবে। কারণ দান-সাদকার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিদের জন্য সওয়াব পৌঁছানো যায়। একই ভাবে রাসূল (সাঃ) এর জন্য কুরবানি করা নিয়েও আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। একদল আলেমের মতে এটা খুবই উত্তম আমল। আরেকদল আলেমের মতে এটা বিদআত। কারণ সাহাবীদেরকে রাসূল (সাঃ) এর পক্ষ থেকে কুরবানি করার নজীর পাওয়া যায় না। শুধু আলী (রাঃ) থেকে পাওয়া যায় যে তিনি রাসূল (সা) এর পক্ষ থেকেও কুরবানি করতেন। কারণ রাসূল (সা) আলীকে (রা) এ ব্যাপারে নসিহত করেছিলেন। মুহাদ্দীসগণের মতে এই হাদীসের বর্ণনা সূত্রটি দূর্বল, এটি জয়ীফ বা দূর্বল হাদীস। আলী (রা) আসলেও রাসুলের (সা) পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। আর করে থাকলেও হয়ত সেটা শুধু আলীর (রা) জন্যেই নসিহত বা আলীর (রা) জন্যেই বিশেষ নির্দেশনা ছিল। আল্লাহ ভাল জানেন।

যাই হোক, ফিরে আসি কুরবানির বাকি আলোচনায়। যার উপর কুরবানি ওয়াজিব না তিনিও চাইলে কুরবানি দিতে পারবেন। কিন্তু যার উপর কুরবানি ওয়াজিব তিনি কুরবানি না আদায় করলে ওয়াজিব ভঙ্গ করার গুনাহ হবে। কোরবানী ওয়াজিব হবার পর কোরবানি না করে সেই টাকা দান করলে বা কারো সাহায্যে খরচ করলে কুরবানি আদায় হবে না। দান করার সওয়াব হবে এবং কুরবানি না করাতে গুনাহ হবে। রাসূল (সাঃ) ঐ ব্যক্তিকে ঈদগাহে আসতে নিষেধ করেছেন যার উপর কুরবানি ওয়াজিব কিন্তু সে কুরবানি করল না। তাই আমাদের সকলের উচিত সামর্থ্য থাকলে কুরবানি আদায় করা।

কুরবানি ও ঈদুল আযহার দিনে করণীয় কিছু কাজ

  • কুরবানির পশু নিজে জবাই করা। জবাই করা সম্ভব না হলে সামনে উপস্থিত থাকা। নবী (সাঃ) হজরত ফাতেমাকে (রাঃ) বলেছিলেন কুরবানির সময় উপস্থিত থাকতে।
  • পশু কুরবানির সময় যারাই ছুড়িতে হাত রাখবেন প্রত্যেককেই বিসমিল্লাহ বলতে হবে। ছুড়িটি হতে হবে ধারালো।
  • যে সকল স্থানে জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব সেসকল স্থানে কুরবানী করতে হবে ঈদের নামাজের পরে। যদি কেউ নামাজের আগে কুরবানি করে তাহলে তা আদায় হবে না। নামাজের পর নতুন করে আরেকটি পশু কুরবানি করতে হবে।
  • কুরবানির গোশত নিজেরা খাওয়া যাবে, বিতরন করা যাবে এবং ভবিষ্যতের জন্য জমা করে রাখা যাবে। কয়েকটি সহীহ হাদীসে পাওয়া যায় ৩ দিনের বেশি কুরবানির গোশত না খাওয়ার জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে অন্যান্য হাদীস দ্বারা এই হাদীসের হুকুম রহিত হয়ে যায়। অর্থাৎ এখন কেউ চাইলে কুরবানির গোশত ফ্রিজে রেখে বা শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারে।
  • কুরবানি দাতা নিজে জবাই না করে অন্য কাউকে দিয়ে জবাই করালে তাকে পারিশ্রমিক দেয়া উচিত। কারণ তিনি ছুড়ি ধার করা, ঝুকি নিয়ে পশু জবাইয়ের কাজটা করেন। এতে যেই পরিশ্রমটা হয় এর মূল্যায়ন আমাদের করা উচিত। মাদরাসার ছাত্ররা পশু জবাই করে দিবে যেন আমরা তাদেরকে চামড়া দেই এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা উচিত। পশুর চামড়া পুরোটাও তাকে দিলেও সেটা কিন্তু তার সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে না। সেটা যাচ্ছে মাদরাসার ফান্ডে। তাই আমাদের উচিত পশু জবাই বাবদ তাদেরকে সম্মানী দেয়া। তবে কোন ক্রমেই এই সম্মানী চামড়া বা পশুর গোশতের দ্বারা দেয়া যাবে না। একই ভাবে কসাইদেরকেও কুরবানির চামড়া বা গোশতের দ্বারা পারিশ্রমিক দেয়া যাবে না। মেহমান হিসেবে তাদেরকে খাওয়াতে বা উপহার হিসেবে দিলে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু পারিশ্রমিক হিসেবে পশুর দড়িটাও তাদেরকে দেয়া যাবে না।
  • কুরবানির পশুর গোশত দিয়ে ঐ দিনের খাওয়া শুরু করা সুন্নাহ।
  • জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা গেলে শরীরের কোন চুল, পশম বা নখ না কাটা উত্তম। বরং কুরবানির দিন কুরবানি করার পরে এগুলো কাটা সুন্নাহ।
  • কারো যদি কুরবানি করার সামর্থ না থাকে তাহলে সে জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা গেলে শরীরের চুল, লোম বা নখ কাটা থেকে বিরত থাকবে। এবং কুরবানির দিন এগুলো কেটে পরিচ্ছন্ন হবে। এটাই তার জন্য কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে। (আবু দাউদ, নাসায়ী)
  • ৯ জিলহজ্জ ফজরের নামাজের পর থেকে ১৩ জিলহজ্জ আসরের নামাজ পর্যন্ত সকল প্রাপ্ত বয়ষ্ক নারী-পুরুষের উপর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব। এই ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর অন্তত একবার তাকবিরে তাশরিক পড়তে হবে। পুরুষেরা উচ্চ স্বরে আর নারীরা নিচু স্বরে পড়া উত্তম। জামাত ছুটে গেলে বা এই ২৩ ওয়াক্তের মধ্যে কোন ওয়াক্ত কাযা হলে সেই কাযা নামাজ পড়ার পর তাকবির পাঠ করতে হবে। কোন নামাজের পরে তাকবিরে তাশরিক পড়তে ভুলে গেলে মনে হবার সাথে সাথে তা পড়ে নিতে হবে। তাকবিরে তাশরিক হচ্ছেঃ الله أكبر .. الله أكبر .. لا إله إلا الله ، الله أكبر .. الله أكبر .. ولله الحمد উচ্চারণঃ “আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, ওয়ালিল্লাহিল হামদ”। অর্থ: “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান! আল্লাহ ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই; এবং আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান! আর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য”।
  • কুরবানির গোশতের ৩ ভাগের এক ভাগ নিজের জন্য রাখা। বাকি দুই ভাগের ১ ভাগ গরিবদের আর আরেক ভাগ প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব। তবে কারো পরিবারের লোক সংখ্যা বেশি হলে বা যে কোনো কারণেই হোক সকল গোশত নিজে খেতে চাইলে বা পুরোটা দান করে দিলেও কুরবানি আদায় হবে। বা ঠিকঠাক ৩ ভাগ না করে দানের পরিমাণ কম বা বেশি করলেও কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সুন্নাহ অনুযায়ী বিতরনের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হবে। অমুসলিমদেরকেও কুরবানির গোশত খেতে দেয়া যাবে। আমাদের গ্রামে প্রতিটা পশুর ৩ ভাগের এক ভাগ একত্রে জমা করা হয়। এরপর গ্রামে যারা কুরবানি দেয় নি তাদের পরিবারের সদস্যদের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পরিমাণে গোশত বিতরণ করা হয়। ঈদের ঐ ২-৩ দিন আমাদের গ্রামের প্রতিটা ঘরেই গোশত রান্না হয়। গ্রামের অসংখ্য কুৎসিত জিনিসের মাঝে এই জিনিসটা আমার কাছে সবচেয়ে ভাল একটা কাজের উদাহরণ। যদিও কয়েক দিন আগে শায়খ আহমাদুল্লাহর একটি ভিডিও লেকচারে দেখলাম এটাকে করতে নিষেধ করেছেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন সমাজে এই রীতি প্রতিষ্ঠা করলে সবাই বাধ্য হয়ে তিন ভাগের এক ভাগ দান করবে। হয়ত কোনো পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়ের সংখ্যা বেশি। ৭ ভাগ গরুর এক ভাগ তার পরিবার আর আত্মীয়স্বজনদের জন্যেই লেগে যাবে। কিন্তু তাও সে যদি মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার ভাগের ৩ ভাগের ১ ভাগ গোশত সমাজের জন্য দান করেন এটা অনুচিত। সেই শায়খের মতে কারো কাছ থেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এভাবে দান নেয়া উচিত নয়। ব্যাপারটা নিয়ে ভিডিওটি দেখার আগে এভাবে ভেবে দেখি নাই।
  • কুরবানির পশুর রক্ত ও অন্যান্য আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা বা মাটি চাপা দেয়া। কোন ক্রমেই যেন পরিবেশ দুর্গন্ধময় না হয়।

যে সব কারণে কুরবানি শুদ্ধ হবে না / ঈদুল আযহার বর্জনীয় কাজ

  • গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানি করলে
  • হারাম উপার্জনের টাকায় কুরবানির পশু ক্রয় করা হলে
  • ‘আল্লাহ খুশি হবেন, আবার গোশতও খাওয়া হবে’ এমন চিন্তা করে কুরবানি করলে
  • কুরবানির পশুর ভাগিদারদের মধ্যে কোন একজন ভাগিদারের নিয়তে সমস্যা থাকলে বাকিদের কুরবানিও শুদ্ধ হবে না
  • ভাগিদারদের মধ্যে কোন একজনেরও যদি পশু কেনার টাকা হারাম উপার্জনের হয়ে থাকে তাহলেও কারো কুরবানি শুদ্ধ হবে না
  • যেখানে জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব সেখানে জিলহজ্জের ১০ তারিখ ঈদুল আযহার নামাজের আগে ও ১২ তারিখ মাগরিবের পরে কুরবানি করলে কুরবানি আদায় হবে না
  • ‘বড় গরু কুরবানি না দিলে কি ইজ্জত থাকে?’ এমন লোক দেখানো মনোভাবের কারণেও কুরবানি শুদ্ধ হবে না
  • ‘গরুটা কিন্যা জিতছি” বা “গরুটা কিন্যা ঠগা হইছে” এই রকম মন্তব্য করা বা মনে আনাও অনুচিত। কারণ কুরবানি আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। যা লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে
  • “গরুর দাম এত টাকা। মোট গোশত হইছে এত কেজি। তার মানে প্রতি কেজির দাম পড়ছে এত টাকা” এই ধরণের হিসাব-নিকাশ করতেও ওলামাগণ নিষেধ করে থাকেন। কুরবানির গোশতের দাম বের করা, বাজারের গোশতের দামের সাথে তুলনা করে লাভ-লোকসানের চিন্তা করাটা সম্ভবত দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক
  • “এইবারের গরুর গোশতটা জানি ক্যামন? খুব একটা খাইতে পারি নাই” বা “গোশত যা খাওয়া খাইছি!!!” অথবা “ভাই গোশত খাইলেন ক্যামন?” এই ধরণের কথাগুলোও সম্ভবত কুরবানির দর্শনের পরিপন্থি
  • বাড়িতে জ্বীন বা শয়তান প্রবেশ করবে না এই উদ্দেশ্যে কুরবানির পশুর রক্ত বাড়ির চারিদিকে ছিটানো একটি মনগড়া কাজ। বা গাছে কুরবানির পশুর মাথার হাড় বা শিং ঝুলিয়ে রাখা। এগুলোর কোনটিই ইসলামের সহিহ দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়

কুরবানির পর শরীকদের নাম উচ্চারণ করে পাঠ করা একটি অহেতুক কাজ

গরু কুরবানির ক্ষেত্রে একটা miss concept আছে অনেকের মধ্যে যে ভাগ হতে হবে বিজোড় সংখ্যায়। ১, ৩ বা ৭ এরকম। পুরোটাই বোগাস একটা চিন্তা। একটা গরু ১ জনের নামে কুরবানি করা যেতে পারে, ২ জন, ৩ জন, ৪ জন, ৫ জন, ৬ জন বা ৭ জনের নামেও কুরবানি করা যাবে। জোড়-বিজোরের কোন মাহাত্ম এই ক্ষেত্রে নাই। কোন একটা গরুর ৭ ভাগের মধ্যে কারো যদি আক্বিকার ভাগ থাকে তাহলেও কুরবানি-আক্বিকা উভয়ই শুদ্ধ হবে।

পশু জবাইয়ের পর হুজুররা কুরবানি দাতাদের পীড়াপিড়িতে একটা কাজ করতে বাধ্য হন। তা হচ্ছে ৭ শরীকের সবার নাম, বাবার নাম পড়া। কুরবানি নিয়ে যতটা না সবাই চিন্তিত হয় তার চেয়ে বেশি চিন্তিত হয় নামটা ঠিকঠাক পড়া হল কিনা। ব্যাপারটা এমন যে, হুজুরের মুখে কুরবানি দাতার নাম উচ্চারণ না করলে যেন আল্লাহ কুরবানি দাতার ব্যাপারে জানবেনই না (নাউযুবিল্লাহ)। শুধু শরীকের নাম বললেই হবে না, তার বাবার নাম বলতে হবে। বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে আবার সিসটেম আলাদা। স্বামীর নাম বলতে হবে!!! stupidity at it’s best!!!

কুরবানির জন্য সেরেফ মনে মনে নিয়ত করাই যথেষ্ট। হুজুরকে দিয়ে কুরবানি দাতার নাম ও কুষ্ঠি পাঠ করানোর মধ্যে নূন্যতম কোন extra good things নাই। আল্লাহ আমাদের সকলের মনের খবর জানেন। হুজুর জবাইয়ের পরে আপনার নামের জায়গায় ভুলে আমার নাম বললেও কুরবানি কিন্তু আপনারটাই আদায় হবে। আমারটা আদায় হবে না। তাহলে কেন এই নাম পড়ার আয়োজন করা হয়? আসুন এবারই এই অহেতুক কাজটা এড়িয়ে যাই।

কুরবানির দিন মুরগি জবাই নিয়ে গ্রাম্য একটা ভুল ধারণা

আমাদের গ্রামে কুরবানির দিন কোন বাড়িতে হাস-মুরগি জবাই করা কঠিন ভাবে নিষেধ। গ্রামের মুরুব্বিরা তাদের মুরুব্বিদের থেকে শুনে আসা ভ্রান্ত ধারণার লালন করেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। এখন থেকে ৮-১০ বছর আগে গ্রামে গিয়ে শুনি “কুরবানির দিন দো পায়া জানোয়ার জবাই করা নিষেধ”। কারণ হিসেবে তারা মনে করেন ইসমাঈল (আঃ) এর মানুষ ছিলেন আর মানুষ হিসেবে তাঁর ছিল দুই পা। তাই হাস-মুরগি জবাই করলে তা ইসমাঈল (আঃ) এর দিকেই ধাবিত হয়। এই ফালতু কথা আমাদের গ্রামের লোকজন কোথা থেকে পেল জানি না। আমি মাদরাসায় পড়ার সুবাদে আমার টিচারদের সাথেও তাদেরকে কথা বলিয়ে দিলাম। তারা সেইসব কথা মানতে নারাজ। তাদের মতের বাইরের কোন তথ্য সামনে আসলেই তারা নবীর (সাঃ) যুগের ইসলাম বিরোধীদের মত বলে ওঠে “বাপ-দাদা, ময়-মুরুব্বিরা যেগুলা কইরা গেছে তারা কি ভুল আছিল? তোরা দুই লাইন সিপারা পইড়াই বিরাট তালেবর সাজোস!!! কত নতুন নতুন হাদীস শুনাবি আর???” আমাদের মানিকগঞ্জ জেলায় এইরকম বেশ কিছু কুসংস্কারের লালন-পালন হয়ে আসছে বহুদিন থেকে। অন্যান্য জেলাতে এই ধারণা আছে কিনা আমার জানা নাই। পাঠকের কাছে অনুরোধ থাকলো আপনার জেলার এরকম মনগড়া ব্যাপারগুলো শেয়ার করার জন্য।

কোথাও কোথাও প্রচলিত আছে আরেকটা ভয়ংকর রেওয়াজ। যারা গরিব বা কুরবানির সামর্থ নাই তারা কুরবানির নিয়তে মোরগ জবাই দিয়ে থাকে। এটাও সম্পূর্ণ নিষেধ। কুরবানির নিয়তে গরু, ছাগল, উট, দুম্বা, ভেড়া, মহিষ ব্যাতিত অন্য কোন পশু কুরবানি জায়েজ নাই। ঈদের দিন সকলেই ভাল খাবার খেতে চায়। সে হিসেবে হাস-মুরগি জবাই করে খাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু মনের মধ্যে এই নিয়ত রাখা যাবে না যে “আমি যেহেতু কুরবানি দিতে পারছি না, তাই মুরগি জবাই করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য”।

কুরবানির চামড়া নিয়ে এলাকার প্রভাবশালীদের নির্লজ্জ ব্যবসা

কুরবানির পশুর চামড়া কেউ যদি চায় শুকিয়ে প্রকৃয়াজাত করে নিজে ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু সেটা বিক্রি করতে পারবে না বা বিক্রি করলেও সেই অর্থ নিজে ব্যবহার করতে পারবে না, বরং গরিবদেরকে দান করে দিতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশে কেউ সাধারণত নিজে চামড়া প্রকৃয়াজাত করে ব্যবহার করে না তাই সাধারণত এটা বিক্রি করে এর মূল্য দান করা হয় গরিব-মিসকিনদেরকে। চামড়ার মূল্য দান করার খাত যাকাতের অর্থ দান করার খাতের অনুরূপ। অর্থাৎ যারা যাকাতের অর্থ খাওয়ার অধিকার রাখে তারাই কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য পাওয়ার অধিকার রাখে। বেশির ভাগ সময় সবাই চেষ্টা করে কুরবানির পশুর চামড়া কোন মাদরাসায় দান করে দিতে। কেননা মাদরাসায় অনেক এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থী থাকে যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব মাদরাসাগুলো নিয়ে থাকে।

কিন্তু অত্যন্ত লজ্জা আর জঘন্য একটা ব্যাপার চোখে পড়ে এই ঈদের দিন। এলাকায় সরকার-দলীয় নেতাকর্মীরা টাকার বান্ডিল হাতে নিয়ে দল বেধে ঘুরে বেড়ায়। যেখানে একটা গরুর চামড়ার দাম ২০০০ টাকা তারা সেই চামড়ার দাম বলে ৫০০ টাকা। ঢাকায় আমার কলোনি, আমার পাশের কলোনিতে দেখেছি কিভাবে জিম্মি করে জোর করে তারা এই চামড়া কিনে থাকে। একবার দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছিল এলাকার নেতারা মাদরাসার ছাত্রদের থেকে চামড়া রেখে দিচ্ছিল। মানুষজন চাইলেও মাদরাসার ছাত্রদেরকে চামড়া দান করতে পারে না। তাদের গুন্ডা বাহিনি এলাকায় কখনো কখনো সশস্ত্র অবস্থায় টহল দিয়ে থাকে। যেন একটা চামড়াও অন্য কোন পার্টি বা মাদরাসার ছেলেপেলে নিতে না পারে। কুরবানি দাতার কাছে এসে তারা আবদারের সুরে বলে “কাকা, বৎসরে একটা দিনই তো! দিয়া দেন…”। এর মানে কি? বছরের এই একটা দিন আপনারা মিসকিন হয়ে গেছেন? এতিম-মিসকিনের হকটা তাই এই দিনেই মেরে খেতে হবে?

আপনার গরুর চামড়াটা যদি মাদরাসায় দান করে দেন তাহলে হয়ত এটা ২০০০ টাকায় বিক্রি করতে পারবে। পুরো টাকাটা সঠিক খাতে ব্যয় হবে। আপনি যদি মাদরাসার ছাত্রদের কাছে চামড়াটা ১০০০ টাকায় বিক্রি করেন তাহলে তারা এটা ২০০০ টাকায় বিক্রি করবে। ১০০০ টাকা তারা লাভ করতে পারবে। আর আপনি চামড়া বিক্রির ১০০০ টাকা আপনার পরিচিত কোন গরিব মানুষকে দিতে পারলেন। তাহলেও এই টাকার সঠিক ব্যবহার হল। কিন্তু, যদি ভদ্রবেশী এই নির্লজ্জ নেতা-ফেতাদের কাছে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন তাহলে আসল হকদার পাবে ৫০০ টাকা। বাকি ১৫০০ টাকা ঢুকবে এই সন্ত্রাসীদের পকেটে। সন্ত্রাসী বললাম এই কারণে যে তারা ত্রাস সৃষ্টি করেই আপনার থেকে কুরবানির চামড়া আদায় করবে। চামড়া নিয়ে গুলাগুলো-কোপাকোপির ঘটনা খুবই সাধারণ ব্যাপার। গত বছর আমাদের সরকারি কলোনিতে আমার আব্বু সহ আরো কয়েকজনকে মুখের সামনে গালাগালি করে গেল এলাকার নেতারা। আমাদের অপরাধ ছিল গরুর চামড়াটা মাদরাসায় দান করে দিয়েছিলাম।

সাধারণত দেখা যায় মাদরাসায় চামড়া বিক্রি করলে এর মূল্য খুব কম দেয়া হয়। ২০০০ টাকার চামড়া মাদরাসার স্টুডেন্টরা ২০০ টাকাও বলতে পারে। কারণ এই চামড়া তারা বিক্রি করে অনেক এতিম স্টুডেন্টদের সারা বছরের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করবে। তারা যদি আপনাকে চামড়ার মূল্য বাবদ অনেক বেশি টাকা দেয় তাহলে তাদের প্রফিটটা কমে যাবে। আর আপনি তাদের সাথে চামড়ার দাম নিয়ে নেগোসিয়েশনই বা কেন করবেন? আপনি তার থেকে ১০ টাকা বেশি পেলেও তো আপনি নিজে এটা খেতে পারবেন না। কাউকে দানই করতে হবে। আপনি নিজে হাতে কাউকে টাকা দিলে যেমন দান, মাদরাসায় দিলেও তো দানই করা হলো। মাদরাসার ছাত্রদের সাথে তাই চামড়ার দাম নিয়ে খুব বেশি দরদাম না করার অনুরোধ রইল। কারণ টাকাটা সে পাবে না। সে ঈদের দিন পরিবার-পরিজনের সাথে না থেকে তার মাদরাসার আরেক এতিম ভাইয়ের জন্য কাজ করতে নেমেছে। আমাকে যদি এলাকার সন্ত্রাসীরা একটা চামড়ার দাম ১৫০০ টাকা দিতে চায়, আর মাদরাসা যদি ২০০ টাকা দিতে চায় আমি তাও মাদরাসাকেই দিব। কারণ এই ২০০ টাকা আমি দান করতে পারব। আর চামড়া বিক্রির প্রফিট থেকে মাদরাসায়ও দান করা হল। কিন্তু এলাকার সন্ত্রাসীদেরকে দিলে অন্তত কয়েকশ টাকা মূল হক্বদারেরা বঞ্চিত হবে। তাই আল্লাহরওয়াস্তে, “ওমুক নেতা এত টাকা বলছে আর মাদরাসা এত কম দাম বলছে! তাইলে নেতার কাছেই বিক্রি করি” এমন নীচু মানসিকতা পোষণ করবেন না।

তাই সকলের প্রতি অনুরোধ, এলাকার ছিচকে সিজনাল চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে আপনার পশুর মূল্যবান চামড়া বিক্রি করবেন না। ভাল হয় যদি কোন মাদরাসায় পুরোটা দান করে দিতে পারেন। অথবা মাদরাসার কাছে নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করেন। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত যেন দরিদ্রদের এই হকটা তারাই যেন পায়।

আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার  মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। (সূরা আন’আম – ১৬২)

আল্লাহ আমাদের সকলকে কুরবানি করার তৌফিক দিন। আমাদের সকলের কুরবানি কবুল করুন। আমীন।

[বিঃ দ্রঃ এটা আমার কোন মৌলিক লেখা নয়। কিছু তথ্যের সন্নিবেশ করেছি মাত্র। কোথাও কোন তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে জানাবেন। আমি ভুলগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।]

রেফারেন্স

লেখাটি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে নিচের সোর্সগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি।

  1. কুরবানীর মাসায়েল – মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া – মাসিক আলকাউসার
  2. যিলহজ্জের প্রথম দশক ও ১০ টি করণীয় – শায়খ আহমাদুল্লাহ
  3. কুরবানীতে যে ভুলগুলো প্রায় সবারই হয়ে থাকে – শায়খ আহমাদুল্লাহ
  4. কুরবানী ও আক্বিকা সম্পর্কিত কিছু কমন প্রশ্নের উত্তর – আহলে হক্ব মিডিয়া
  5. কুরবানী সম্পর্কিত ৫২ টি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর – শায়খ আহমাদুল্লাহ

22 thoughts on “ঈদুল আযহা ও কুরবানিঃ ফজিলত, আমল ও মাসআলা

  1. কুরবানি দেয়ার আগ পর্যন্ত কিছু না খেয়ে থাকা, কুরবানি করার সাথে সাথে উপবাস ভাঙা। এই কাজটি কতটুকু সরিয়ত সম্মত? উত্তরটি যদি মেইল করে জানাতেন উপকৃত হতাম।

    1. কুরবানির দিন কুরবানির সাথে সাথে উপবাস ভাঙা নয়, বরং কুরবানির পশুর গোশত দিয়ে উপবাস ভাঙা মুস্তাহাব। বুখারি শরীফের এই হাদীসটা নেট ঘেটে পেলামঃ
      Volume 7, Book 68, Number 478 :
      Narrated by Abu ‘Ubaid
      The freed slave of Ibn Azhar that he witnessed the Day of ‘Id-al-Adha with ‘Umar bin Al-Khattab. ‘Umar offered the ‘Id prayer before the sermon and then delivered the sermon before the people, saying, “O people! Allah’s Apostle has forbidden you to fast (on the first day of) each of these two ‘Ida, for one of them is the Day of breaking your fast, and the other is the one, on which you eat the meat of your sacrifices.”

      1. কোরবানি ঈদের দিন কোরবানি ব্যাতিত
        অন্য গরু খাওয়ার জন্য যারা কোরবানি
        দিতে সক্ষম নয় তারা সম্মিলিত ভাবে
        জবেহ করলে তার হুকুম কি ।

        1. কুরবানির নিয়ত ছাড়া সবাই মিলে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে গরু জবাই করতেই পারে। দোকান থেকে গোশত কিনে এনে খাওয়া আর নিজেরা ভাগে গরু জবাই করা আসলে একই ব্যাপার।

  2. I am very very pleased to read this post. I have learnt many matter about korbani.
    Enamul sir, Thank you very much.

  3. ১০-১২ তারিখে নেসাব পরিমাণ অর্থ আছে কিন্তু তার চেয়ে বেশি অর্থ ঋণ থাকলে কোরবানি হুকুম কি দয়া করে জানাবেন।

    1. মাসিক আল কাউসারের ওয়েবসাইটে অনুরূপ একটা প্রশ্নের উত্তর শেয়ার করছিঃ

      নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক যদি কুরবানীর দিনগুলোতে সাময়িক ঋণগ্রস্ত থাকে যা পরিশোধ করে দিলে তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ বাকি থাকে না তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে না। আর যদি ঋণ আদায় করে দিলেও নেসাব পরিমাণ সম্পদ বাকি থাকে তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯২

  4. নেসাব পরিমান সম্পদ বলতে কি নগদ টাকা, স্বর্ন/রৌপ্য এর মুল্য? নাকি যেকোনো সম্পদ? যেমন ১। আমার বাবা আমাকে ৬০ হাজার টাকায় অমুক জিনিষ কিনে দিল। তাহলে কি আমার কুরবানী ওয়াজিব?
    ২। আমার কাছে ৬০ হাজার টাকা আছে।আমি পুরোটা দিয়ে অমুক জিনিষ কিনলাম।আমার কাছে আর কোন টাকা বা স্বর্ন/রৌপ্য নেই।তাহলে কি আমার কুরবানী ওয়াজিব?

    1. ১। আপনার বাবা যদি আপনাকে ব্যবসায়ের জন্য ৬০ হাজার টাকা দিয়ে কিছু কিনে দেন যেটা দিয়ে আপনি বিজনেস করবেন, বা সেটার ভাল দাম পেলে আপনি বিক্রি করবেন তাহলে সেটা নিসাব বলে গণ্য হবে এবং কুরবানি ওয়াজিব হবে। কিন্তু আপনার ব্যবহারের জন্য ৬০ হাজার টাকায় একটা ল্যাপটপ কিনে দিলেন এটা নিসাবের মধ্যে পরবে না। ৬০ হাজার টাকার জমি কিনে দিলে সেটা যদি আপনার দৈনন্দিত প্রয়োজনের অতিরিক্ত হিসাবে থেকে যায় তাহলেও কুরবানি ওয়াজিব হবে। ইসলাম সঞ্চয় করাকে ডিসকারেজ করে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আমাদের হাতে জমা হলে তাতে আল্লাহ দরীদ্রদের অধিকার দিয়ে দেন। তাই সম্পদকে পবিত্র করার জন্য বা গরীবের হক গরীবকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আমরা যাকাত দিই। কুরবানিও সেরকমই একটা আর্থিক ইবাদত, যদিও আল্লাহ আমাদেরকে এর দ্বারা দুনিয়ার জীবনেও লাভবান হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন গোশত খাওয়া ও খাওয়ানোর মাধ্যমে।

      ২। নিসাব বা কুরবানি ওয়াজিব হবার জন্য এক্সাক্ট স্বর্ণ বা রূপা থাকা জরুরি না। ডেইলি লাইফ লিড করতে যা প্রয়োজন এর বেশি সম্পদের পরিমাণ যদি ৬০ হাজার হয় তাহলেও কুরবানি ওয়াজিব হবে। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে হয়ত এটা আরো ক্লিয়ার হয়ে গেছে।
      আল্লাহই সকল বিষয়ে ভাল জানেন।

  5. কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা, এই শর্তটা কোন হাদিস বা কুরানের আয়াত দ্বারা সাব্যস্থ হয়েছে ? দয়া করে বলবেন কি ?

    1. হাদীসে বলা হয়েছে সামর্থ্য থাকলে কুরবানি দিতে হবে। আলেমগণ সম্ভবত এই সামর্থ্যের ডেফিনেশন হিসাবে নিসাবকে বুঝিয়েছেন। আমি এই পয়েন্টটি নিয়েছি প্রসিদ্ধ মাসিক আলকাউসার এর পোস্ট থেকে। আমি যেহেতু আলেম নই তাই এ ব্যাপারে বিস্তারিত গবেষণা করা আমার জন্য কঠিন। আপনি চাইলে আলকাউসার পোর্টালে প্রশ্ন রাখতে পারেন এটার দলীলের বিষয়ে। তাঁরা ইনশাআল্লাহ সুযোগ মত আপনার প্রশ্নের উত্তর দিবেন।

  6. জাযাকাল্লাহ। আপনার বাড়ি মানিকগঞ্জের কোথায় ? আমার বাড়ি ধল্লা , সিংগাইরে।

    1. ভাই, এটা আমার জানা নাই। কোনো আলেমের সাথে সামনা সামনি কথা বলে ভুলের ব্যাপারে উল্লেখ করে জেনে নিবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *