পোস্টটি পড়া হয়েছে 2,191 বার
প্রোগ্রামিং কনটেস্ট নাকি ফ্রিল্যান্সিং

“ভালবাসা দিবি কিনা বল?” বনাম “জোর করে ভালবাসা হয় না”

“ভাইয়া,
গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখব নাকি ওয়েব ডিজাইন শিখব? শুনেছি এন্ড্রয়েড এপের নাকি সেই লেভেলের চাহিদা… ডট নেটের মার্কেট এখন ক্যামন?”

প্রশ্নগুলো শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে নিজের মাথাতেই আউলা লাগে!
মুরুব্বিদের থেকে শুনে শুনে ইদানীং আমিও এই টাইপের প্রশ্নের উত্তরে বলি “আপনার যেইটা করতে ভাল লাগে, যেইটাকে আপনি ভালবাসেন সেইটা করেন”। যদিও আমি নিশ্চিত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মনে মনে প্রশ্নকর্তা ভাবেন “হেহ… একটা গুরুপের এডমিন হইয়া ভাবে পাউ মাডিত পড়ে না!!!”
ভাইডি!!! রকেট সায়েন্টিস্টের ম্যালা কদর। অইবেন নি? ডাইরেক নাাসা…!!!

যাই হোক, গুরুজনেরা বলেন টাকার পিছনে দৌড়ালে আজীবন টাকার পিছনেই দৌড়াতে হয়। এর চেয়ে বরং ভালবাসার পিছনে দৌড়ান (অবশ্যই পজিটিভ অর্থে)। এই দৌড়ের মধ্যে আনন্দ পাবেন। আপনি কোন জিনিসটা শিখবেন সেটা আমাকে জিজ্ঞেস করার অর্থ অনেকটা এরকম যে “ভাই, আমার কী খেতে পছন্দ?” মানে আপনার নিজের পছন্দ আপনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। আপনার কোন কাজ ভাললাগে বা কোন কাজটাকে ভালবেসে ঘন্টার পর ঘন্টা করতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন সেটাই আপনার করা উচিত।




যারা নিয়মিত সাইক্লিং করেন বা লম্বা ট্যুর দেন তাদেরও কিন্তু ভীষণ পরিশ্রম আর কষ্ট হয়। কিন্তু সেটাতেই তারা আনন্দ পায়। আমি যতবার ঢাকার বাইরে সাইকেল নিয়ে রাইড দেই ততবারই প্রতিজ্ঞা করি আর জীবনেও রাইড দিব না! কিন্তু সেটা আর মানা হয় না। যারা ক্লাইম্বিং করেন, পর্বতারোহী, তাদেরকে পাহাড় রীতিমত ডাকে। এই মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটা পদক্ষেপ তারা উপভোগ করেন। আরামের সমতল তাদের টানে না। এটাতেই কিন্তু আনন্দ! একই ভাবে আরেকটা আনন্দের কথা এই মাত্রই মাথায় আসল। যেই আনন্দের সাথেও পরিশ্রম ও ক্লান্তি যুক্ত। সরাসরি বললাম না, ১৮+ এঙ্গেলে চিন্তা করে নিয়েন 😛

আপনার যদি সি ল্যাঙ্গুয়েজের কোড হাবিজাবি মনে হয়, এক্কেবারেই কোন স্বাদ না পান তাহলে বাদ দেন। দেখেন কোনটা ভাল লাগে। আপনার জন্য হতে পারে পাইথন স্যুট করবে। আবার আপনার হয়ত কালো কনসোলে খটখট করে ইনপুট দিয়ে ঐখানেই কাজ করতে যুত লাগে না, ওয়েবের ফর্ম বানিয়ে নানা রকম ভেল্কি দেখতে ভাল লাগে। হতে পারে আপনি ভালবাসেন ডিজাইনিং। তাহলে আপনি তাই-ই করেন… বাজারে কোনটার চাহিদা কেমন সেটা যাচাই করে ভালবাসতে গেলে আপনার আর সেই প্রফেশন/প্ল্যাটফর্মের মধ্যকার কথাবার্তা হতে পারে এই পোস্টের শুরুর দুইটা সংলাপের মত! আপনি হুমকি দিবেন, সে ভেংচি কাটবে!

আমরা সি প্রোগ্রামিং আর ডাটা+এলগো’র কোর্স  চালাতে গিয়ে এক রকম বিপদেই পড়েছি বলা চলে। বিপদে পড়ে বিপথে যাবার জোগাড়! কোর্সের পোস্ট দেখে ১০ জন নক/কল দিলে ৭ জনই আগে জিজ্ঞেস করে এন্ড্রয়েডের তো এখন অনেক চাহিদা, যে কোন প্রতিষ্ঠানেই এই কোর্স করায় আপনারা এগুলা করান না? এন্ড্রয়েড/ওয়েবের কোর্স চালু করলে জানায়েন, সি শিখে আমার পোষাবে না। জিজ্ঞেস করলে জানা যায় সি এর ব্যাসিক তার বেশ ভাল। ইফ-এলস/টিফ এলস পর্যন্ত তার কোন সমস্যা নাই। এখন তার এন্ড্রয়েড শিখতে হবে, কারণ প্লে স্টোরে বিশেষ রাতের প্রস্তুতিমূলক এপ আপলোড দিয়ে হাগার হাগার ডলার কামানো লাগবে!

এই যদি হয় টার্গেট তাহলে মনে হয় এই লাইন ত্যাগ করা ভাল। কারণ একজন ভাল প্রোগ্রামার, যিনি কোডের সাথে কথা বলেন। কোডের সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারেন। তিনি কখনো নিজেকে এতটা দূর্বল ভাববেন না যে কোন একটা প্ল্যাটফর্মের টুলস ইউজ করার কোর্স করতে চাইবেন। (এর ব্যাতিক্রমও থাকতে পারে। আবার আমার চিন্তাধারা পুরোটা ভুলও হতে পারে।) আমরা যখন অনলাইন কনটেস্টের কথা বলি তখন অনেকেই এটা সরাসরিই বলেন “সময় নষ্ট”! হয়ত বাজারে এইসব কোর্সের আকাশচুম্বি চাহিদা দেখে একদিন আমরাও শুরুর অবস্থান থেকে সরে গিয়ে এসব কোর্স শুরু করব। তাই উপরে বললাম বিপথগামী হতেও পারি আমরা।

উপরের এই প্রশ্নগুলো করেন সাধারণত ভার্সিটির শেষের দিকের শিক্ষার্থীরা। যাদের সামনে অন্ধকার! একেবারে হতাশার শেষ প্রান্তে এসে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরতে থাকে একটুখানি আশার আলো দেখার জন্য। ফ্যামিলির কথা চিন্তা করে হলেও তাকে চিন্তা করতে হয় কোন লাইনে গেলে এট লিস্ট পাশ করে বাবার সামনে একটা চাকরি নিয়ে দাঁড়াতে পারব। তাই আসলে এক তরফা তাদেরকে দোষ দেয়াও অনুচিত। এই লেখাটা মূলত যারা ভার্সিটি লাইফের শুরুর দিকে “এঞ্জয়িং ভার্সিটি লাইফ” মুডে আছো তাদের জন্য (তুমি করেই বললাম। আমি ফোর্থ ইয়ারে মাত্র উঠলেও ভার্সিটিতে চার বছরের বেশি পার করে ফেলেছি)। মৌজ-মাস্তি, হ্যাং-আউট আর সাজগোজ করে প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে সেলফি তোলার মধ্যে যারা ঘুরপাক খাচ্ছ তারা জাস্ট চোখ বন্ধ করে ৩ বছর পরের কোন একটা দিনের কথা চিন্তা কর। গফ/বফের সাথে ভবিষ্যতের স্বপ্নের জাল বুনার পাশাপাশি এটাও চিন্তা কইরো কোন কোয়ালিটি ছাড়া পাশ করে বের হবার পরে তোমার বোনা জালের কেজি কত টাকা হবে? আর সেই জাল বেঁচে সংসার চলবে কিনা।

তাই বলে শুরুতেই আবার মহা সিরিয়াস হয়ে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করতে নেমে যেও না। এতে কোন একটা লাইনে তুমি হয়ত এক্সপার্ট হবা কিন্তু তোমার জানার পরিধিটা কমে আসবে। অনেক অনেক বিষয়েই দেখবা তুমি কাঁচা রয়ে গেছ যা তোমার জানার কথা ছিল। কোন একটা নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে এক্সপার্ট হবার জন্য কাজ কর থার্ড ইয়ারের শেষের দিকে এসে। এর আগে যত পার প্রবলেম সলভ কর, থিওরিটিক্যাল নলেজ যা নেয়ার নাও। নানান দিকের নলেজ গ্যাদার কর। যেগুলো সিলেবাসে আছে বা যেগুলো নাই। সব্বব…

সেদিন একটা বইয়ে পড়লাম আল্লাহ আমাদের সৃষ্টির আগেই রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সেই রিযিক আমরা হাতি-ঘোড়া লেভেলের কোডার হয়েও সংগ্রহ করতে পারি অথবা মোড়ের দোকানে ভেলপুরি বেচেও সংগ্রহ করতে পারি। আমার কপালের লেখা জিনিস আমার হাতে আসবেই। আমরা চেষ্টা করে হয়ত ভাল উপায়ে সেটা আনতে পারি। পড়ালেখার একমাত্র উদ্দেশ্য যেন অর্থ উপার্জন না হয়। অর্থ আসবেই, কিন্তু মন থেকে যদি চাই জ্ঞানার্জন করতে তাহলে মনটা অন্তত পরিষ্কার থাকল। পড়া বা একটা প্রবলেম সলভ করার পরে একটা শান্তি পাবেন, একটা আনন্দ পাবেন। একটা আত্মতৃপ্তি নিয়ে অনুভব করবেন এই অর্জিত জ্ঞান শুধুই আপনার!

আসুন অনেক ভাল প্রোগ্রামার হবার চেয়ে, এই অসুস্থ্য সময়ে অনেক ভাল মানুষ হবার দিকে বেশি গুরুত্ব দেই।
প্রোগ্রামিং শেখাটা কিন্তু ফরজ না… 😉

3 thoughts on ““ভালবাসা দিবি কিনা বল?” বনাম “জোর করে ভালবাসা হয় না”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *