পোস্টটি পড়া হয়েছে 6,420 বার
কাদিয়ানী সম্প্রদায় যে কারণে মুসলমান না

কাদিয়ানী সম্প্রদায় যে কারণে মুসলমান না [বই রিভিউ – ১৪]

Post updated on 24th October, 2022 at 09:24 pm

বৃটিশ সরকার কর্তৃক কাদিয়ানী ধর্মের সৃষ্টিলগ্ন থেকে মুসলিম আলেম সমাজ তাদের আক্বিদা ও বিশ্বাসের বিরোধিতা করে আসছেন। কাদিয়ানীরা মুখে নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করলেও ইসলামের আক্বিদা ও বিশ্বাসের সাথে অনেকগুলো বিষয়ে সাংঘর্ষিক বিশ্বাস তারা লালন করে। মুখে নিজেকে মুসলিম দাবী করার পর কেউ যদি মূর্তি পূজা করে তাহলে যেমন ঐ লোককে মুসলিম বলা হবে না। ঠিক একই রকম আক্বিদা ও বিশ্বাসের মৌলিক পার্থক্যের জন্য কাদিয়ানীদেরকে কাফের বলে সাব্যস্ত করেন সকল মুসলিম আলেমগণ। কাদিয়ানী সম্প্রদায় যে কারণে মুসলমান না এই বইটিতে খুব সাধারন কিন্তু মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে খুব স্পষ্ট ভাবেই বুঝা যাবে কাদিয়ানী ধর্মের সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্যগুলো। আমার ব্লগে এর আগে কাদিয়ানী মতবাদ বোঝার সহজ উপায় নামক বইয়ের রিভিউ লিখেছিলাম। সেই বইটি ছিল বেশ ছোট। সেই তুলনায় আজকের বইটি আরো বিস্তৃত এবং তথ্যবহুল।

ঈমানের পরিচয়

বইটির শুরুতে কালিয়ামে তাইয়্যেবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (সা) এর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কালিমার প্রথম অংশে বলা আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য আর কোনো ইলাহা নাই। দ্বিতীয় অংশ বলা হয়েছে মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল। এই দ্বিতীয় অংশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে বইটির শুরুর দিকে। নবীজিকে (সা) আল্লাহর রাসূল হিসাবে সাক্ষ্য দেয়ার মানে হচ্ছে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে নবী (সা) সম্পর্কিত যে সকল বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার কথা আমরা জানতে পেরেছি। তার সবগুলোকে স্বীকার করে নেয়া। কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি নবী (সা) সর্বশেষ নবী ও রাসূল।

আল্লাহ কুরআন কারীমে বলেছেন যে, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের হালাল-হারাম সহ অন্যান্য বিধান অপরিবর্তিত থাকবে। এর দ্বারা বুঝা যায় নবী (সা) হচ্ছেন খাতামুন নাবীয়্যিন। অর্থাৎ সর্বশেষ নবী। নবী (সা) এর খতমে নবুওয়াতের আক্বিদা ও বিশ্বাস ইসলামের অন্যমত মূল ভিত্তি। যদি কেউ বিশ্বাস করে নবীজির (সা) পরেও আর কোনো নবী আসতে পারে। তাহলে সে কালিমায়ে তাইয়্যেবার দ্বিতীয় অংশের খন্ডিত বিশ্বাস লালন করে। অর্থাৎ ইসলামের বিশ্বাসের সাথে তার বিশ্বাস পুরোপুরি এক নয়। এরকম খন্ডিত বিশ্বাসের লোককে মুসলিম বলা যায় না।

কাদিয়ানী ধর্মের প্রবক্তা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজেকে নবী বলে দাবী করেছে। ঈসা মসীহ বলে দাবী করেছে। নিজেকে সে আরো দাবী করেছে মাহদী হিসাবে। তার অনুসারীরা তাকে নবী বলেই বিশ্বাস করে। তাকে জিল্লি নবী বা ছায়া নবী বলে বর্ণনা করে। সে হিসাবে কাদিয়ানী সম্প্রদায় নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করলেও। কালিমায়ে তাইয়্যেবার দ্বিতীয় অংশের আক্বিদা-বিশ্বাসের বিপরীত বিশ্বাস লালন করার কারণে তারা মোটেও মুসলিম নয়।

লেখক অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় কুরআন-হাদীসের বিভিন্ন দলিল উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন যে কাদিয়ানীরা সন্দেহাতীত ভাবে বেঈমান ও কাফের।

কাদিয়ানীর ব্যর্থ ভবিষ্যতবাণী, মিথ্যাচার ও অশ্লীল কথন

আল্লাহর প্রেরিত নবীগণের কিছু সাধারন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন তারা কখনো মিথ্যা বলেন না। নবীগণ কর্তৃক অশালীন বা অশ্লীল শব্দচয়নের কল্পনাও করা যায় না। আল্লাহর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া কোনো বিষয় বা ভবিষ্যতবাণী নবীদের ক্ষেত্রে কখনো মিথ্যা হয় না।

নবুওয়তের ধারাবাহিকতা যদি বন্ধ নাও হত। তবুও বলতেই হবে কাদিয়ানীর মত লোক কখনো নবুওয়তের যোগ্য হত না। কারণ সে কথায় কথায় মিথ্যা বলো, অশ্লীল শব্দ ও ব্যাক্য ব্যবহার করত। আল্লাহর ওহির দাবী করে প্রচুর ভবিষ্যতবাণী সে করেছিল যেগুলোর কোনোটাই সত্য হয় নি। মির্জা গোলামের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল যে, সে কথায় কথায় বিভিন্ন ভবিষ্যতবাণী প্রচার করত। এগুলোর সাথে সে এমন দাবী জুড়ে দিত যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো ওহি। এটা যদি সংঘটিত না হয় তাহলে সে নবী না। এই কথা মিথ্যা হলে সে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবে। পরবর্তীতে দেখা যে সেগুলো মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তার মাথামোটা সাগরেদরা সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে বরং বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কুফরির উপর অটল থাকত।

লেখক কাদিয়ানীর করা বেশ কিছু ভবিষ্যতবাণী, মিথ্যাচার ও অশ্লীল কথার প্রমাণ বইটিতে উল্লেখ করেছেন। যার সবগুলো নেয়া হয়েছে কাদিয়ানীর লেখা বিভিন্ন বই থেকে। অনুসন্ধানী পাঠক চাইলে মূল গ্রন্থগুলো থেকে কাদিয়ানীর এসকল বক্তব্য পড়তে পারেন। লেখক বইটিতে কাদিয়ানীর লেখা বইয়ের রেফারেন্স, খন্ড ও পৃষ্ঠা নাম্বার সহ উল্লেখ করেছেন।

মির্জা গোলাম কাদিয়ানীর বিভিন্ন দাবীদাওয়া ও আক্বিদা-বিশ্বাস

মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ছিল বরাবরই inconsistant. তার আগের কথার সাথে পরের কথার মিল নাই। একটা দাবীর সাথে আরেকটা দাবী সাংঘর্ষিক। অনেকেই মনে করেন কাদিয়ানী ছিল সিজোফ্রেনিয়া নামক মানসিক রুগি। যার কারণে সে তার কোনো একটি কথার উপর স্থির থাকতে পারত না। তার জীবদ্দশায় ইংরেশ তোশনের লক্ষ্যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব দাবী-দাওয়া পেশ করেছে। কিম্ভূতকিমাকার সব আক্বিদা-বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। সেখান থেকে আলোচ্য বইতে উল্লেখিত কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো।

কাদিয়ানী নিজেকে নবী দাবী করে

এক সময় কাদিয়ানী নবীজিকে (সা) সর্বশেষ নবী বা খাতামুন নাবিয়্যিন বলে স্বীকার করত। এটি তার লেখা বইতেই রয়েছে। পরবর্তীতে সে নিজেকে এক সময় নবী ও রাসূল দাবী করে। বইটিতে এই বিস্তারিত বিবরন পাওয়া যাবে। বিভিন্ন মনগড়া অপব্যাখ্যা দিয়ে কাদিয়ানী খতমে নবুওয়াতকে অস্বীকার করে। তার মনগড়া অপব্যাখ্যা সম্পর্কে বইটিতে বিস্তারিত বলা হয়েছে। সেগুলো যে কতটা হাস্যকর ও বিভ্রান্তিকর সেগুলো যে কোনো পাঠকের নিকট সহজেই বোধগম্য হবে।

কাদিয়ানী নিজেকে ঈসা মাসীহ তথা মসীহে মওঊদ দাবী করে

কাদিয়ানী সম্প্রদায় মির্জা গোলামকে মসীহে মওঊদ বা প্রতিশ্রুত মসীহ বা ঈসা (আ) হিসাবে বিশ্বাস করে। নবী-রাসূল দাবীর পাশাপাশি নিজেকে সে ঈসা (আ) হিসাবে দাবী করে। কুরআন-হাদীসে স্পষ্টত বলা হয়েছে যে ঈসা (আ)-কে ইহুদীরা হত্যা করতে পারে নি। বরং জীবিত অবস্থায় তাকে আল্লাহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। কিয়ামতের আগে আবার তাকে পাঠাবেন। কাদিয়ানীরা ইসলামী আক্বিদার এই সুসংহত বিশ্বাসটিকে গ্রহন করে না। কাদিয়ানীর মতে ঈসা (আ) স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যু বরণ করেছেন। যেই মারইয়ামকে (আ) কুরআনে বলা হয়েছে সিদ্দিকা। তিনি ছিলেন পুতপবিত্র। কিন্তু মির্জা গোলার কাদিয়ানীর বিশ্বাস হলো ঈসা (আ) অন্য আর দশ জন শিশুর মতই জন্ম নিয়েছেন। কুমারী মাতা মারইয়ামের (আ) চরিত্র নিয়ে ইহুদীরা যেমন মিথ্যাচার করেছে। কাদিয়ানীও সেই সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চেয়েছে যে মারইয়াম (আ) কুমারি ছিলেন না। ইহুদীদের দাবীর অনুকরণে সে মারইয়াম (আ) এর সাথে জনৈক ইউসুফের অবৈধ সম্পর্ক ও পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে বিয়ে হয়েছে। এমন অপবাদ দিয়েছে। নাউযুবিল্লাহ।

কাদিয়ানীর দাবী হচ্ছে সে নিজেই প্রতিশ্রুত মসীহ। সে দাবী করে তার মা ছিল মারইয়াম (আ)। ২ বছর বয়স পর্যন্ত সে মারইয়াম (আ) এর কাছে লালিত পালিত হয়েছে। এরপর তার মধ্যে মসীহের রূহ ফুঁকে দেয়া হয়েছে। এরকম উল্টাপাল্টা দাবীর ক্ষেত্রে কাদিয়ানীর কোনো জুড়ি নেই।

কাদিয়ানী নিজেকে মাহদী দাবী করেছে

কেয়ামতের আগে মাহদির আগমন ঘটবে। এটা হাদীসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। তার আগমন ঘটবে মক্কা থেকে। কাদিয়ানী নিজেকে মাহদীও দাবী করেছে। যদিও সে তার দীর্ঘ জীবনে মক্কা মদীনায় যায় নি। 

কাদিয়ানীর পুনর্জন্মের বিশ্বাসঃ তার দাবী সে নিজেই মুহাম্মাদ

মানসিক বিকৃতির সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহনকারী এই মির্জা গোলাম কাদিয়ানী ছিল অনেকটা হিন্দুদের মত পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। সে নিজেকে নবী দাবী করেই ক্ষ্যান্ত হয় নি। বরং সে দাবী করত তার মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা) এর সত্ত্বাই প্রকাশ পেয়েছে। মির্জা গোলামের পুত্র বশীর আহমাদের মতে প্রথম বার মুহাম্মদের (সা) আগমনের তুলনায় দ্বিতীয় বার মির্জা গোলামের মাধ্যমে আবির্ভাবে তার রুহানিয়্যাত অধিকরত শক্তিশালী, অধিকতর পূর্ণাঙ্গ ও পরিপক্ক। (নাউযুবিল্লাহ)। সে দাবী করে প্রথমবার নবীর (সা) আবির্ভাবের পর যারা তাঁকে অস্বীকার করেছিল তারা যদি কাফের সাব্যস্ত হয়। তাহলে দ্বিতীয়বার তার আবির্ভাবকে যারা অস্বীকার করবে তারাও কাফের সাব্যস্ত হবে। নাউযুবিল্লাহ।

কুরআন দ্বারা স্বীকৃত ঈসা (আ) এর মুজিজা কাদিয়ানী কর্তৃক অস্বীকার

সূরা আলে ইমরানের ৪৯ নং আয়াতে আল্লাহ ঈসা (আ) এর কয়েকটি মু’জিজার কথা উল্লেখ করেন। তিনি কাদা মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি বানিয়ে ফুঁ দিতেন। ফলে তা আল্লাহর হুকুমে জীবন্ত পাখি হয়ে উড়ে যেত। তিনি আল্লাহর হুকুমে কুষ্ঠ ও অন্ধ রোগিকে সুস্থ্য করতে পারতেন। কাদিয়ানী তার বইতে এসকল কিছুকে অস্বীকার করেছে। কাদা মাটি দিয়ে পাখি বানিয়ে ফুঁ দেয়ার বিষয়টিকে মুশরিকসুলভ বিশ্বাস হিসাবে আখ্যা দিয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য মুজিজাগুলোকে হাতের কারসাজি বা ধোকাবাজি হিসাবে সে উল্লেখ করেছে। নাউযুবিল্লাহ। তার চেষ্টা ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর মর্যাদাকে খাটো করে দেখিয়ে নিজেকে উচ্চ মর্যাদার ব্যক্তি হিসাবে প্রমাণ করা।

অবতারবাদঃ নিজেকে কখনো কৃষ্ণ, কখনো খৃষ্ট বলে দাবী

অবতারবাদের ধারনাটি হিন্দুধর্ম ও প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের বিশ্বাস। তাদের এ বিশ্বাসটি খৃষ্টধর্মেও অনুপ্রবেশ করেছে। এ বিশ্বাসের ধারনাটির মূলকথা হলোঃ ঈশ্বর কখনো কখনো মানবরূপে পৃথিবীতে আসে অধর্মনাশ ও ধর্ম সংস্থাপনের জন্য। হিন্দুধর্মে বলা হয় শ্রীকৃষ্ণ ভগবানের অষ্টম অবতার। তাই তারা কৃষ্ণকে ভগবান কৃষ্ণ বলে থাকে ও তার পূজাঅর্চনা করে থাকে। খৃষ্টানরাও ঈসাকে (আ) ঈশ্বর হিসাবে বিশ্বাস করে থাকে। আমাদের আলোচ্য চরিত্র গোলাম কাদিয়ানী নিজেকে এরকম অবতার দাবী করা থেকেও বাদ যায় নি। সে তার বিভিন্ন স্বপ্ন ও ধ্যানধারনা থেকে বলার চেষ্টা করেছে যে, সেই আসলে কৃষ্ণ। সে হিন্দু ধর্ম, খৃষ্ট ধর্ম সহ সকলের সংস্কারের জন্য এসেছে বলেও দাবী করে।

এই লোক আরো দাবী করেছে যে, সে নাকি ওহির মাধ্যমে জানতে পেরেছে কোনো বিষয়ে “হয়ে যাও” বললে সেটা হয়ে যাবে। অর্থাৎ কুরআনে যেই গুণটি আল্লাহ তাঁর নিজের জন্য উল্লেখ করেছেন। সেই ক্ষমতার দাবী করতেও কাদিয়ানী পিছপা হয় নাই।

এহেন শক্তিমান লোকটি কিন্তু জায়গায় জায়গায় নাস্তানাবুদ হয়েছে। সে চেয়েছিল মুহাম্মদী বেগম নামক এক মেয়েদে বিয়ে করতে। সেটা পারে নাই। দাবী করেছিল এই বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছে, এটা হবেই। সে বলেছিল তার প্রিয় কাদিয়ান নামক গ্রামকে কোনো মহামারি স্পর্শ করবে না। কিন্তু অঞ্চলটি প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিল। গর্বের সাথে সে বলেছিল তার কলেরা হবে না। তার কলেরা হয়েছিল এবং মরেছেও সে কলেরাতেই। অনেকে বলে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে টয়লেটে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। তাই ব্যঙ্গ করে অনেকে টয়লেটকে বুঝাতে “কাদিয়ানী অফিস” কথাটি ব্যবহার করেন। কাদিয়ানী ঘোষণা করেছিল যে, তার সাথে বিতর্ককারী মাওলানা সানাউল্লাহ তার আগেই মারা যাবে। কিন্তু সে নিজেই আগে মরেছে। তার মারা যাওয়ার পর সানাউল্লাহ সাহেব আরো ৪০ বছর জীবিত ছিলেন।

সাধারন ভাবে সমস্ত মুসলিমকে কাফের সাব্যস্ত করা ও নিজেদের স্বাতন্ত্রের ঘোষণা

কাদিয়ানী ও তার মুরিদেরা প্রকাশ্যেই অন্যান্য মুসলিমদেরকে কাফের হিসাবে ঘোষণা দিত। যারা তাকে নবী বলে মানবে না তাদেরকে কাফের আখ্যা দিত। মুসলিমদের থেকে তাদের নামাজ, রোজা, হজ্জ ও অন্যান্য সকল মাসআলা ভিন্ন বলেও তারা ঘোষণা দিয়েছে। কাদিয়ানী দাবী করেছে পৃথিবী থেকে কুরআন উঠে গিয়েছিল। তাকে নবুওয়ত দিয়ে আবার কুরআন সহ তাকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। এমন কি কুরআনে বর্ণিত মুহাম্মাদ (সা) এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি আয়াতকে সে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেছে। তার দাবী হলো কুরআনের সেই আয়াতগুলো দ্বারা তাকেই বুঝানো হয়েছে। আর কাদিয়ানীই হলো শেষ নবী, এমন হাস্যকর দাবীও উঠে এসেছে তার বইতে।

জিহাদকে অস্বীকার করাঃ ইংরেজদের সহযোগিতা করাকে ফরজ-ওয়াজিব আখ্যা দেয়া

কুরআন ও হাদীস দ্বারা জিহাদের প্রয়োজনীয়তা ও ফজিলত অনস্বীকার্য। কিন্তু কাদিয়ানী ঘোষণা করে যে জিহাদ বর্তমান সময়ে আর চলবে না। এটা তার শরীয়তে রহিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ তাকে যে নবুওয়াত দিয়ে পাঠানো হয়েছে সেই ধর্মে জিহাদ হারাম। কাদিয়ানী মূলত ছিল ইংরেজদের সৃষ্টি একটি ধর্ম। যখন মুসলিম আলেম সমাজ ও মুসলিম জনগোষ্ঠী ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের জযবায় প্রস্ফুটিত। ইংরেজদেরকে পদে পদে মার দিচ্ছে। তখন জিহাদ সম্পর্কে এমন বক্তব্য প্রচারটা ইংরেজদের জন্য জরুরি ছিল। আর তাদের উচ্ছিষ্ট ভোগী, পা চাটা গোলাম “মির্জা গোলাম কাদিয়ানী” ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে হারাম ঘোষণা করে। বরং ইংরেজদের প্রশংসা ও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে ফরজ-ওয়াজিব কাজ বলে ফতোয়া দেয়।

কাদিয়ানী একটি স্বতন্ত্র ধর্ম, এরা নিজেদেরকে “আহমদী মুসলিম” বলে পরিচয় দেয়

কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম হিসাবে ঘোষণা করার ব্যাপারে আলেমগণ এতটা তৎপর কেন? তারা নিজেদেরকে শুধু মুসলিম না বলে “আহমদী মুসলিম জামাত” বলে পরিচয় দেয়। কারণ গোলাম আহমদ তাদের নবী। আর তারা এই গোলাম আহমদ নামক ভন্ড নবীর উম্মত। একজন খৃষ্টান বা ইহুদী যদি নিজেদেরকে মুসলিম হিসাবে পরিচয় দেয় তাহলে কি তা মেনে নেয়া যাবে? ঠিক একই ব্যাপার এই কাদিয়ানীদের ব্যাপারেও। একজন খৃষ্টান ব্যক্তি মুসলিম সমাজে খৃষ্ট ধর্মের দাওয়াত দিয়ে যতটা না ক্ষতি করতে পারে। একজন কাদিয়ানী মুসলিম নাম ধারণ করে তার চেয়ে বহু মানুষকে বেঈমান করে ফেলতে পারে। আমাদের সমাজে দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা ও এসকল বিষয় নিয়ে পড়াশোনার পরিমাণ খুবই নগন্য। তাই কাদিয়ানীদের পক্ষে খুব সহজেই মুসলিমদেরকে কাদিয়ানী ধর্মে কনভার্ট করা সহজ। বাংলাদেশের পাহাড়ি ও সীমান্ত অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে কাদিয়ানী তৎপরতা বিদ্যমান। তাই অন্য ধর্মের অনুসারীরা যতটা না মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ। তার চেয়ে অনেক বড় হুমকি এই ছদ্মবেশী কাফেররা।

কাদিয়ানীদের সম্পর্কে কয়েকটি মাসআলা

লেখক বইয়ের শেষে কাদিয়ানীদের সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা উল্লেখ করেছেন। যেহেতু তারা গোপনে আমাদের ঈমান ধ্বংস করতে বদ্ধ পরিকর। তাই আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। মাসআলাগুলো হচ্ছেঃ

  1. যেহেতু এ সম্প্রদায়টি মুসলিম নয়। আবার ইহুদী বা খৃষ্টান তথা আহলে কিতাব নয়। তাই তাদের সাথে মুসলিমদের বিবাহ জায়েজ নাই। কোনো মুসলিমের সাথে কোনো কাদিয়ানীর বিয়ে হলে তাদের সন্তান ইসলামী শরীয়তে অবৈধ সন্তান বলে বিবেচিত হবে। এজন্য বিবাহের আগে নিশ্চিত হওয়া চাই অপর পক্ষ কাদিয়ানী নয়।
  2. কাদিয়ানীরা যেহেতু মুসলিম নয়। তাই তাদের দ্বারা জবাইকৃত পশুর গোশত হালাল নয়। বাজার থেকে গোশত কেনার আগে এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে কসাই মুসলিম কিনা।
  3. মুসলিমদের ইবাদতখানাকে মসজিদ বলা হয়। কাদিয়ানীরা যেহেতু মুসলিম নয় তাই তাদের ইবাদতখানাকে মসজিদ বলা জায়েজ নাই। তাদের ইবাদতখানে তারা “আহমদী মসজিদ” বলে থাকে। এমন মসজিদে তাদের ইমামতিতে নামাজ আদায় করা বৈধ নয়।
  4. শোনা যায়, কোনো কোনো এলাকায় মসজিদের ইমাম হিসাবে কাদিয়ানী ধর্মের অনুসারী ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয়। এই ইমামের পিছনে নামাজ পড়লে নামাজ হবে না।
  5. কাদিয়ানীরা যেহেতু মুসলিম নয়, তাই তাদের জানা পড়াও জায়েজ নাই। তাদেরকে মুসলিমদের কবরস্থানে কবর দেয়া অবৈধ। কিছুদিন আগে এক কাদিয়ানী বাবা তার শিশু সন্তানকে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করেছিল। এটা নিয়ে মিডিয়ায় খবর পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল।
  6. মুসলিম ব্যক্তির উত্তরাধিকার কেবল মুসলিমরাই হতে পারে। তাই কারো সন্তান বা নিকটাত্মীয় কাদিয়ানী ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে সে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

বইটি সম্পর্কে কিছু তথ্য

নামঃ কাদিয়ানী সম্প্রদায় যে কারণে মুসলমান না

লেখকঃ মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

প্রকাশনীঃ আলোকধারা প্রকাশন

প্রকাশকালঃ এপ্রিল ২০২১

পৃষ্ঠাঃ ১৪৪

মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা

প্রাপ্তিস্থানঃ ঢাকার নিলক্ষেত, কাটাবন সহ সকল ইসলামী বইয়ের দোকানে পাওয়া যেতে পারে। আমি অনলাইনে নিয়ামাহ বুক শপ থেকে বইটি সংগ্রহ করেছি।

কাদিয়ানী ধর্মমত সম্পর্কে আরো জানতে পড়ুন

  1. কাদিয়ানী মতবাদ বোঝার সহজ উপায় – শায়খ মনযুর নুমানী রহ.
  2. ইতিহাসের খলনায়ক – ইমরান রাইহান
  3. জীবনের খেলাঘরে – মাওলানা মুহিউদ্দীন খান
  4. মির্জা গোলামের মিথ্যা নবুয়ত দাবীর নমুনা – মাসিক আলকাউসার
  5. কাদিয়ানী ধর্মমত – সমস্যা উপলব্ধি ও সমাধানের সহজ পথ – মাসিক আলকাউসার
  6. কুরআনের বিকৃত অনুবাদের প্রদর্শনী করছে কাদিয়ানী সম্প্রদায়
  7. কাদিয়ানী মতবাদ : নবুওতে মুহাম্মদীর প্রতি এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ
  8. কাদিয়ানী এবং অন্যান্য কাফেরের মধ্যে পার্থক্য
  9. মির্যা কাদিয়ানীর বৃটিশ তোষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *