পোস্টটি পড়া হয়েছে 4,403 বার
নামাজের সময়সূচী

ফরজ ও নফল নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

Post updated on 3rd August, 2021 at 11:55 pm

একটি সহীহ হাদীসের ভাষ্য মোতাবেক আমরা জানি যে, প্রত্যেক নর-নারীর উপর জ্ঞান শিক্ষা করা ফরজ। আমাদের সমাজে অনেকেই এই জ্ঞান বলতে মূলত স্কুল-কলেজের জেনারেল শিক্ষাকে বুঝিয়ে থাকেন। SSC, HSC, অনার্স, মাস্টার্স ইত্যাদি শিক্ষা অর্জন কি এই হাদীসের উদ্দেশ্য? উক্ত হাদীসে প্রত্যেক নর-নারীর উপর ঐ সকল জ্ঞান অর্জনকে ফরজ বলা হয়েছে, যে জ্ঞান না থাকলে ইসলামের মৌলিক বিধিবিধান পালন করা সম্ভব হয় না।

যেমনঃ নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, সুদ-রিবা ইত্যাদি বিষয়ে নূন্যতম জ্ঞান শিক্ষা করা। যা অর্জন না করলে একজন মুসলিম বিপথে চলে যেতে পারেন। সালাত সংক্রান্ত মৌলিক ও প্রাথমিক জ্ঞানগুলো শিক্ষা করা আমাদের প্রত্যেকের উপর ফরজ। এই জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে সালাত আদায় করার পদ্ধতি, বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত, সালাতের ফরজ-ওয়াজিব বিধান, সালাত ভঙ্গের কারণ ইত্যাদি। সালাতের ভিতরে ও বাহিরে যে ফরজগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওয়াক্ত মত নামাজ পড়া। অর্থাৎ ওয়াক্ত মত নামাজ না পড়লে নামাজের একটি ফরজ ছুটে যাবে। ফলে নামাজ বিশুদ্ধ হবে না। তাই নামাজের ওয়াক্ত বা নামাজের সময়সূচীগুলোর বিষয়ে আমাদের ধারনা রাখা অত্যন্ত জরুরি।

এই ব্লগ পোস্টে নিম্নোক্ত সালাতের ওয়াক্ত সমূহ নিয়ে আমরা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহঃ

  1. ফজরের সালাতের সময়সীমা
  2. সূর্যোদয়ের নিষিদ্ধ সময়
  3. সালাতুদ দুহা (চাশত, ইশরাক) এর সময়সীমা
  4. দ্বিপ্রহরের নিষিদ্ধ সময়
  5. যুহরের সালাতের সময়সীমা
  6. জাওয়াল নামাজের সময়সীমা
  7. আসরের নামাজের সময়সীমা
  8. সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময়
  9. মাগরিবের নামাজের সময়সীমা
  10. মাগরিবের পরে ও ইশার আগের নামাজের সময়সীমা
  11. ইশার নামাজের সময়সীমা
  12. তাহাজ্জুদ নামাজের সময়সীমা

এই পোস্টটি সংকলন করার প্রেক্ষাপটটি একটু বলি। নামাজের সময়সূচী ও সাহরি-ইফতারের সময়সূচীর জন্য আমাদের ডেভেলপ করা Muslims Day অ্যাপটি পরিচালনা করতে গিয়ে আমি বহু মানুষকে দেখেছি, যারা নামাজের সঠিক সময় জানেন না। আমরা অ্যাপে সঠিক সময় দেখালে, তারা না জানার কারণে সঠিক সময়কেই “ভুল” বলে আমাদের গালমন্দ করেন। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষকে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে নামাজের সময়গুলো। বয়সে পৌঢ় অনেক ব্যক্তিকেও দেখা যায় বিষয়গুলো সম্পর্কে একেবারেই অন্ধকারে আছেন। তাই একেবারে আম জনতার উপযোগি একটি ব্লগপোস্ট লিখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেখান থেকে কিছু আল্লাহর বান্দাও হয়ত উপকৃত হতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

আমি যেহেতু আরবি ভাষা, কুরআন, হাদীস, তাফসীর, রিজাল শাস্ত্র, ফিকহ ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। তাই যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাদের মতামতের আলোকেই পোস্টটি লিখছি। এজন্য এখানে হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা এনে সেগুলোর বিশুদ্ধতা যাচাই এবং দলিল উপস্থাপনের দিকে যাব না। কোন্ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে কোন্ কথাটি বেশি শক্তিশালী বা কোন কথাটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা এ পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। এখানে শুধু হুকুম বা মাসআলাটি জানিয়ে দেয়া উদ্দেশ্য। যেন বাংলা পড়তে পারেন এমন যে কেউই লেখাটি থেকে জেনে নিতে পারেন সালাতের সময়সীমা। যে সকল মাসআলায় ফিকহী ইখতিলাফ (মতপার্থক্য) আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে হানাফী ফিকহ অনুসরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি ইখতিলাফী মাসআলার সাথে উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি অন্যান্য মাজহাবের মতটিও। তাই আপনি যে মাজহাবেরই অনুসরণ করেন না কেন, আশা করি এখান থেকে উপকৃত হবেন।

আমরা এই পোস্ট থেকে মোটা দাগে সালাতের সময়সীমার ব্যাসিক বিষয়গুলো জেনে নিব। কিন্তু অনেক ভাইকেই পাওয়া যাবে যারা আপত্তি তুলবেন পোস্টে হাদীসের দলীল উল্লেখ করে সেগুলোর তাহকীক করা নাই কেন? যারা দলিল আদিল্লার বিষয়ে জানতে এবং আরও বিস্তারিত ভাবে পড়তে আগ্রহী, তারা চাইলে পোস্টের শেষে উল্লেখিত তথ্যসূত্রের লেখাগুলো পড়তে পারেন। পরবর্তীতে আরো বিশদ ভাবে জানতে ও বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য আমরা আলেমদের স্মরণাপন্ন হব এবং তাদের তত্ত্বাবধানে থেকে বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ বুঝে নিব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের ইলম অর্জনের এই পথচলাকে মৃত্যু পর্যন্ত চলমান রাখুন। আমীন।


Give Ad - Click here

সংক্ষেপে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়সূচী

বিস্তারিত আলোচনার আগে অল্প কথায় প্রত্যেক নামাজের time duration গুলো সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক।

  1. সুবহে সাদিক তথা সাহরির সময় শেষ হলে এরপর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। সূর্য ওঠা শুরু হলে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়।
  2. সূর্য মধ্য আকাশ থেকে যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে তখন যুহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। আসরের ওয়াক্তের আগ পর্যন্ত যুহরের ওয়াক্ত থাকে। হানাফী মাজহাবের মতে কোনো বস্তুর ছায়ার দৈর্ঘ্য যখন ঐ বস্তুর দ্বিগুণ হয় তখন যুহরের ওয়াক্ত শেষ হয়। অন্যান্য মাজহাবের মতে কোনো বস্তুর ছায়া ঐ বস্তুর সমান হয় তখন যুহরের ওয়াক্ত শেষ হয়। উভয় মতের পক্ষেই হাদীসের দলিল রয়েছে।
  3. যুহরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সাথে সাথে আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়। যুহরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সময় নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় আসরের শুরুর ওয়াক্ত নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফী মাজহাবের মতে কোনো বস্তুর ছায়ার দৈর্ঘ্য তার দ্বিগুণ হলে আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়। অন্যান্য মাজহাবের ইমামদের মতে বস্তুর ছায়ার দৈর্ঘ্য ঐ বস্তুর সমান হলেই আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়। সূর্যাস্ত বা মাগরিবের ওয়াক্তের আগ পর্যন্ত আসরের ওয়াক্ত থাকে
  4. সূর্য পরিপূর্ণ ভাবে অস্তমিত হওয়ার পর মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হয়। ইশার ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত মাগরিবের ওয়াক্ত থাকে। মাগরিবের ওয়াক্ত থাকে শাফাক অদৃশ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত। শাফাকের সংজ্ঞা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ঘড়ির কাটার হিসাবে ঋতুভেদে মাগরিবের ওয়াক্তের সময় থাকে প্রায় সোয়া ১ ঘন্টা বা এর কিছু কম বা বেশি। লোক মুখে শোনা যায় মাগরিবের ওয়াক্ত ১৫-২০ মিনিট। এ কথাটি সঠিক নয়।
  5. শাফাক অদৃশ্য হওয়ার পর তথা মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সাথে সাথে ইশার ওয়াক্ত শুরু হয়। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী ইশার ওয়াক্ত থাকে সুবহে সাদিক বা ফজরের ওয়াক্ত শুরুর আগ পর্যন্ত। কিন্তু মধ্যরাতের পর ইশা আদায় করা মাকরুহ। অন্যান্য মাজহাবের আলোকে ইশার শেষ সময় হচ্ছে মধ্যরাত। মধ্যরাত বলতে রাত ১২ টা নয়, বরং মধ্যরাত বলতে বুঝানো হয় সূর্যাস্ত থেকে ফজরের এই পুরো সময়ের middle point-কে। উদাহরনঃ সূর্যাস্ত যদি সন্ধ্যায় ৬টায় হয় আর ফজরের ওয়াক্ত যদি ভোর ৪টায় শুরু হয় তাহলে মধ্যরাত হবে রাত ১১টায়।

আলহামদুলিল্লাহ। আমরা অতি সংক্ষেপে ৫ ওয়াক্ত সালাতের সময়সীমা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা লাভ করেছি। এখন ৫ ওয়াক্ত নামাজের সময়সূচী সহ নফল নামাজের সময়সূচী সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

ফজরের নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ফজরের ওয়াক্ত থাকে। সূর্য ওঠা শুরু হলে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়। সূর্যোদয় চলাকালীন সময়ে সকল ধরনের নামাজ পড়া নিষেধ।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সূর্যোদয়ের আগে সূর্য যখন ভূমির আনুভূমিকের সাপেক্ষে ১৮ ডিগ্রি নিচে অবস্থান করে তখন পূব আকাশে দিগন্ত বিস্তৃত হয়ে হালকা সাদা আলো দেখা যায়। একে সুবহে সাদিক বলে। এই সময় থেকেই ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। তবে আমরা চাইলেই দেশের যে কোনো জায়গা থেকে একদিন শেষ রাতে উঠেই সুবহে সাদিক বুঝতে পারব না। এটা বুঝার জন্য শেষ রাতে কৃত্রিম আলো বিহীন এলাকায় দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ঢাকা বা দেশের বিভাগীয় শহরে চোখে দেখে সুবহে সাদিকের সময় নির্ণয় করা অম্ভবই বটে। তাই আমাদের বিভিন্ন অ্যাপ বা সময়সূচীর ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে হয়।

আমরা উল্লেখ করেয়ছি সুবহে সাদিকের সময় সূর্য ভূমির সাপেক্ষে ১৮ ডিগ্রি নিচের দিকে অবস্থান করে। এই ১৮ ডিগ্রির হিসাবটা কি কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত? উত্তর হচ্ছে এই ডিগ্রির পরিমাপটি ইসলামী শরীয়ত দ্বারা সরাসরি প্রমাণিত নয়। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলেমগণ তাদের গবেষণার মাধ্যমে এটি প্রমাণ করেন যে, চাক্ষুশ ভাবে যে সময়ে সুবহে সাদিক অবলোকন করা হয় সে সময়ে সূর্য ভূমি থেকে ১৮ ডিগ্রির মত নিচে অবস্থান করে। এরই আলোকে নামাজের সময়সূচীর ক্যালেন্ডার প্রণয়ন ও অনুসরণ করা হয়। 

হানাফী মাজহাবের মতানুসারে ইশার সালাতের ওয়াক্ত শেষ হয় সুবহে সাদিকের সাথে সাথে। আর শীয়া সম্প্রদায় ব্যতীত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের চার মাজহাবের সকল ইমামগণই এ ব্যাপারে একমত যে, সাহরির শেষ সময়ও এই সুবহে সাদিকের সময়। রমজান মাসে সুবহে সাদিকের সময়ে আমরা সাহরি খাওয়া শেষ করি এবং এর ২-৩ মিনিট পর ফজরের আজান হয়ে থাকে। এর ১০-১৫ মিনিট পরেই মসজিদে ফজরের জামায়াত হয়। কিন্তু বছরের অন্যান্য সময়ে সাধারনত সুবহে সাদিকের অনেক পরে গিয়ে ফজরের আজান হয়।

উদাহারণ স্বরূপ বলা যায়, আজকের (১৮ জুলাই ২০২১) সুবহে সাদিকের সময় ছিল রাত ৩টা বেজে ৫৭ মিনিটে। অর্থাৎ হানাফী মাজহাব অনুসারে ৩ঃ৫৭ তে ইশার ওয়াক্ত শেষ হয়েছে। সকল মাজহাবের মতে ৩ঃ৫৭ তে সাহরির সময় শেষ হয়েছে। সকল মাজহাবের মতে ৩ঃ৫৮ তে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়েছে। এখন রমজান মাস হলে ভোর ৪টা বা ৪ঃ০৫ এ ফজরের আজান হত। ভোর ৪ঃ১৫ বা ৪ঃ২০ এ ফজরের জামাত হত। কিন্তু এখন রমজান মাস না হওয়ায় ৩ঃ৫৮ তে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলেও ফজরের আজান হয় ৪ঃ২৫ বা ৪ঃ৩০ এর দিকে। এর ১৫-২০ মিনিট পর ফজরের জামাত হয়ে থাকে। বিষয়টি নিয়ে অনেক ভাইবোনদের মাঝে কনফিউশন থাকায়  বিস্তারিত আলোচনা করলাম।

ফজরের নামাজের উত্তম সময়

হানাফী মাজহাবের ওলামাদের মতেঃ সুবহে সাদিকে পরে যখন পূর্ব আকাশে উত্তর-দক্ষিণে যখন আলো ছড়িয়ে পড়ে তখন ফজরের সালাত আদায় করা উত্তম। একটি সহীহ হাদীসের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় নবীজির (সা) ফজরের সালাত অন্ধকার কেটে যাওয়ার পর আদায় করতে বলেছেন। কারণ তা পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ।

ফজর দেরিতে পড়লে জামায়াতে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। জামায়াতে যত বেশি লোক সংখ্যা হবে তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’য়ালার কাছে তত বেশি পছন্দীয় হবে। অর্থাৎ জামায়াতে লোকসংখ্যা বেশি হলে সওয়াবও বেশি হবে। এজন্য ফজরের জামায়াত একটু আলোকিত হওয়ার পর আদায় করা উত্তম।

হাদীসের অনেকগুলো বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় যে, নবী (সা) অন্ধকার থাকতেই ফজরের সালাত আদায় করতেন। তাঁর সময়ের সাহাবাগণ (রা) অত্যন্ত কর্মঠ ছিলেন। তারা নিয়মিত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন এবং অন্ধকার থাকা অবস্থাতেও সকলেই জামায়াতে শরীক হতেন। কিন্তু নবীজি (সা) জানতেন ইসলাম পরবর্তীতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়বে। তখন মানুষের মধ্যে শিথিলতা চলে আসবে। তখন জামায়াতে লোকসংখ্যা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খানিকটা আলোকিত হওয়ার পর ফজর পড়ার ব্যাপারে তিনি (সা) উৎসাহ দিয়েছেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত ইবরাহীম নাখয়ী (রহ) বলেনঃ “মুহাম্মাদ (সা) এর সাহাবীগণ ফজরের সালাত আলোকিত করে আদায় করার বিষয়ে যেরূপ ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন, এরূপ আর কোনো বিষয়ে তারা এমত হননি”।

ফজরের উত্তম সময় নিয়ে অন্যান্য মাজহাবে ভিন্ন মত থেকে থাকতে পারে।

নিষিদ্ধ সময়ঃ সূর্যোদয়ের সময় নামাজ পড়া নিষেধ

সূর্য ওঠা শুরু হওয়ার সময় থেকে পরিপূর্ণ ভাবে তা উদিত হতে যে সময় লাগে, সে সময়টুকু সকল প্রকার সালাত আদায় নিষিদ্ধ। ঘড়ির কাটার হিসাবে এ সময়টি ১৫ মিনিটের বেশি নয়। আবহাওয়া অফিস বা বিভিন্ন অ্যাপ থেকে আমরা সূর্যোদয়ের যে সময় দেখতে পাই। সে সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৫ মিনিট এই নিষিদ্ধ সময় হিসাবে গণ্য হবে।

ফজরের সালাতের সময়সূচীর আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্ট হয়েছি যে, সুবহে সাদিক থেকে সূর্য ওঠা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ফজরের নামাজ পড়া যায়। প্রশ্ন হচ্ছে যদি অনিচ্ছাকৃত ঘুম থেকে দেরিতে ওঠা হয় আর উঠে দেখা যায় সূর্যোদয়ের সময় শুরু হয়ে গিয়েছে, তখন কী করব?

এ ব্যাপারে আমাদের হানাফী মাজহাবের ওলামা একরামের বক্তব্য হচ্ছেঃ যদি সূর্যোদয়ের শুরুর আগে ফজরের নামাজ শেষ না করা যায় অর্থাৎ নামাজ শুরুর পর শেষ হওয়ার আগেই সূর্যোদয় শুরু হয়ে যায়। তাহলে ঐ নামাজটি শুদ্ধ হবে না। পুনরায় তা আদায় করতে হবে। তাই এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে ঘুম থেকে ওঠার পর অযু করার পর যদি দেখা যায় সূর্যোদয় শুরুর আগেই ফরজ ২ রাকাত সালাত আদায় করা পরিমাণ সময় পাওয়া যাবে। তাহলে ২ রাকাত ফরজ আদায় করে নিবে। এরপর সূর্য পুরোপুরি উঠে গেলে অর্থাৎ সূর্যোদয়ের সময় থেকে প্রায় ১৫ মিনিট পরে ফজরের সুন্নত ২ রাকাত নামাজ পড়ে নিবে। আর যদি সূর্যোদয়ের আগে ২ রাকাত নামাজ পড়ার মত সময় না থাকে তাহলে সূর্য পুরোপুরি উদিত হওয়ার জন্য ১৫ মিনিটের মত সময় অপেক্ষা করে এরপর ২ রাকাত সুন্নত ও ২ রাকাত ফরজ পড়বে।

সূর্যোদয়ের নিষিদ্ধ সময়ে ফজরের নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে হানাফী মাজহাব ব্যতীত অন্যান্য মাজহাবের ইমামগণ ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ) ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তাদের মতে সূর্য ওঠা শুরু হওয়ার আগে যদি অন্তত ১ রাকাত ফরজ নামাজ পড়া যায় তাহলে উক্ত নামাজ আদায় হয়ে যাবে। অর্থাৎ ১ রাকাত সূর্যোদয় শুরুর আগে এবং বাকি এক রাকাত সূর্যোদয় হচ্ছে এমন অবস্থায় পড়া হলেও তাদের মতে নামাজ আদায় হয়ে যাবে।

সালাতুদ দুহা বা চাশত, ইশরাক নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

সূর্যোদয়ের শুরুর সময় থেকে পরবর্তী ১৫ মিনিট পর্যন্ত নামাজের নিষিদ্ধ সময় হিসাবে ধরা হয়। এই সময় পার হয়ে যাওয়ার পর থেকে সালাতুদ দুহার ওয়াক্ত শুরু হয়। এটি একটি নফল সালাত। তাহাজ্জুদের পরেই নফল সালাতের মধ্যে সালাতুদ দুহার অবস্থান। এই সালাতকে চাশত ও ইশরাকের সালাতও বলা হয়। ২ থেকে ১২ রাকাত বা সাধ্যমত আরও বেশি পরিমানে আমরা এ সালাত আদায় করতে পারি। সালাতুদ দুহার শেষ সময় হচ্ছে সূর্য দুপুর বেলা মধ্য আকাশে খাড়া অবস্থানে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। খালি চোখে বা নিজ অভিজ্ঞতায় দ্বিপ্রহরের এই সময়টি পরিমাপ করা আমাদের অনেকের জন্য কঠিন। এটাকে সহজ করার জন্য আমাদের ডেভেলপ করা Muslims Day অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারেন। সেখানে আমরা সকল নামাজের ওয়াক্ত এবং নিষিদ্ধ সময়েরও উল্লেখ করে থাকি।

নিষিদ্ধ সময়ঃ দ্বিপ্রহরের সময় নামাজ পড়া নিষেধ

সূর্য যখন মধ্য আকাশে থাকে, দ্বিপ্রহরের সেই সময়টি নামাজ পড়া নিষেধ। দ্বিপ্রহরের এই সময়টি ঋতুভেদে ২-৩ মিনিটের মত হয়ে থাকে। কিন্তু বাড়তি সতর্কতার জন্য একে ৬ মিনিট ধরা হয়। সূর্য একদম মধ্য আকাশে থাকা অবস্থা থেকে যখন একটু পশ্চিমে হেলে পড়ে তখন নিষিদ্ধ সময় শেষ হয় এবং যুহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। দ্বিপ্রহর বলতে সময়টি এক্সাক্ট দুপুর ১২টা নয়। ঋতুভেদে এর সময় ১২টার আগেপরেও হতে পারে।

যুহরের নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

দ্বিপ্রহরের নিষিদ্ধ সময় শেষ হওয়ার পরপরই যুহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। অর্থাৎ সূর্য যখন ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে খাড়া মাথার উপর থাকে সেই অবস্থান থেকে যখন পশ্চিম দিকে হেলে যায়। তখন জোহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। আসরের ওয়াক্ত শুরুর আগ পর্যন্ত যুহরের ওয়াক্ত থাকে। তবে যুহরের ওয়াক্ত কখন শেষ হয় বা আসর কখন শুরু হয় এ নিয়ে ইমামগণের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে।

হানাফী ওলামাদের মতে যুহরের ওয়াক্ত শেষ হয়, যখন কোনো বস্তুর ছায়ার দৈর্ঘ্য ঐ বস্তুটির চেয়ে দ্বিগুণ হয়। অন্যান্য মাজহাবের আলেমদের মতে যুহরের ওয়াক্ত শেষ হয়, যখন কোনো বস্তুর ছায়ার দৈর্ঘ্য ঐ বস্তুর সমান হয়।

ঘড়ির কাটার হিসাবে যুহরের শেষ ওয়াক্ত বর্তমানে (১৮ জুলাই) প্রায় বিকাল ৪ঃ৪৫ পর্যন্ত। তবে এত দেরি করে নামাজ পড়া কখনোই কাম্য নয়।

যুহর ও জুমআর নামাজের উত্তম সময়

শীতকালে যুহরের নামাজ আগেভাগে পড়া উত্তম। আর গরমকালে যুহরের নামাজ এক মিসিল এর চারভাগের শেষ ভাগ সময়ে পড়া উত্তম। এক মিসিল বলতে ঐ সময়কে বুঝানো হয় যখন কোনো বস্তুর ছায়ার দৈর্ঘ্য ঐ বস্তুর সমান সমান হয়। উত্তম হওয়ার এই মাসআলাটি হানাফী মাজহাবের মাসআলা। অন্য মাজহাবে ভিন্ন মত থাকতে পারে।

শীত ও গরমকাল উভয় সময়ই জুমআর সালাত আউয়াল ওয়াক্তে তথা ওয়াক্ত হওয়ার পরপরই যথাসম্ভব আগেভাগে পড়া উত্তম।

জাওয়ালের নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

একটি নফল সালাত রয়েছে যুহরের ওয়াক্ত শুরুর সাথে সাথে। যা যাওয়াল নামে পরিচিত। দ্বিপ্রহরের নিষিদ্ধ সময়ের পরে যখন যুহরের ওয়াক্ত শুরু হয় তখনই জাওয়ালের ওয়াক্ত হয়। এই সালাতের রাকাত সংখ্যা দুই বা চার। একে দিনের বেলার তাহাজ্জুদ বলা হয়। এ সময় আল্লাহ তায়ালা আসমানের দরজাগুলো খুলে দেন। অনেক আলেম এই নফল সালাতকে আলাদা করেন না বরং যুহরের আগে যে চার রাকাত সালাত আদায় করা হয় সেটিকেই জাওয়ালের সালাত হিসাবে গণ্য করেন। তাই আমরা সুযোগ থাকলে বাড়তি ৪ রাকাত নফল সালাত যুহরের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে আদায় করতে পারি। সম্ভব না হলে যুহরের আগের চার রাকাত সুন্নত নামাজও যাওয়ালের নামাজ হিসাবে আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আসরের নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

যুহরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সাথে সাথে আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত আসরের ওয়াক্ত থাকে। আমরা যুহরের ওয়াক্তের বর্ণনার থেকে জেনেছি যে, যুহরের শেষ সময় নিয়ে আলেমদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। আর যুহরের শেষ সময়ের পরপরই যেহেতু আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়। তাই একই কারণে আসরের শুরুর ওয়াক্ত নিয়েও ইমামগণের মাঝে দ্বিমত রয়েছে।

হানাফী ওলামাদের মতে কোনো বস্তুর ছায়ার দৈর্ঘ্য যখন ঐ বস্তুর দ্বিগুণ হয় তখন যুহরের ওয়াক্ত শেষ এবং আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়। অন্যান্য মাজহাবের আলেমগণের মতে ছায়ার দৈর্ঘ্য বস্তুর সমান হলেই যুহরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে আসরের ওয়াক্ত শুরু হবে।

বাংলাদেশে যেহেতু বেশির ভাগ মানুষ হানাফী ফিকহ অনুসরণ করে থাকেন, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে প্রায় সকল মসজিদেই আসরের নামাজ হয় বিকালে। বর্তমানে (জুলাই ২০২১) আসরের আযান হয় বিকাল ৫টার দিকে। আর অন্যান্য মাজহাবের মাসআলা অনুযায়ী আসরের ওয়াক্ত শুরু হয় এখন দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে।

আসরের ওয়াক্তের শুরুর সময় নিয়ে আমাদের মুসলিমস ডে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপের ইউজারদের থেকে প্রায়ই বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ অনেক ইউজারই অ্যাপে দেখানো সময়গুলো ক্রসচেক করে দেখেন আমরা সঠিক সময় দেখাচ্ছি কিনা। এটা নিঃসন্দেহে ভাল একটি কাজ। কিন্তু তারা সাধারনত নামাজের ওয়াক্ত জানার জন্য গুগলে সার্চ করেন বা ইন্টারন্যাশনাল কোনো অ্যাপ ব্যবহার করে সময় যাচাই করেন। অন্যান্য দেশে যেহেতু শাফেয়ী, হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী বেশি আর গুগল সহ বাইরের অ্যাপগুলোতে বাই ডিফল্ট সেই মাজহাব অনুযায়ী সময় দেখানো হয়। তাই ইউজারগণ বলে থাকেন যে অন্যান্য অ্যাপে আসরের ওয়াক্ত দেয়া সাড়ে ৩টায়, আমাদের অ্যাপে এটা পৌনে ৫টায় কেন? আমাদের অ্যাপেও চাইলে আপনি আসরের নামাজের ওয়াক্ত দুপুর সাড়ে ৩টায় দেখতে পাবেন। যদি সেটিংস থেকে মাজহাব পরিবর্তন করে নেন। আসলে সালাতের ওয়াক্ত নিয়ে যে ইমামগণের মধ্যে স্বীকৃত মতপার্থক্য রয়েছে এ বিষয়ে আমরা অনেকেই জানি না। তাই না জানার কারণে সঠিক বিষয়কেও আমরা ভুল মনে করি। আশা করি এই লেখাটি পড়ার পর পাঠকগণ বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

আসরের নামাজের উত্তম সময়

ওয়াক্ত হওয়ার পর আসরের সালাত খানিকটা দেরি করে পড়া উত্তম। ঋতুভেদে আসরের ওয়াক্ত হওয়ার আধা ঘন্টা থেকে পৌনে ১ ঘন্টা পর আসরের সালাত আদায় করা উত্তম হবে। যাতে আসরের আগে বেশি করে নফল বা সুন্নত সালাত আদায় করা যায়। আসরের সালাতের পরে কোনো নফল সালাত আদায় করা মাকরুহ। উত্তম সময়ের এই বক্তব্যটি হানাফী মাজহাবের ওলামাদের মত। এ ব্যাপারে অন্য মাজহাবে ভিন্ন মত থাকতে পারে।

নিষিদ্ধ সময়ঃ সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়া নিষেধ

সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায় নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র যদি ঐদিনের আসরের সালাত কোনো কারণবশত আদায় করা না হয়ে থাকে তাহলে সে সালাতটি শুধু সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময় চলাকালীন সময়েও আদায় করা যাবে। এটি হানাফী ফিকহের অভিমত। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের কারণে নামাজ বিনষ্ট হবে কিনা এটা একটা ইজতিহাদী বিষয়। এটা নিয়ে সাহাবীগণের (রা) মাঝেও মতানৈক্য ছিল। তাই আমাদের সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকতে হবে যেন কোনো ক্রমেই আসরের সালাত সূর্যাস্তের সময় পর্যন্ত বিলম্বিত না হয়। যদি অনিচ্ছাকৃত হঠাৎ এরকম হয়ে যায় তাহলে সূর্যাস্তের সময়ও আসরের সালাত পড়ে নিব। যেহেতু এর পক্ষেও সাহাবীগণ (রা) ও হানাফী মাজহাবের ইমামগণের ফতোয়া রয়েছে।

গুগলে বা পত্রিকায় সূর্যাস্তের যে সময় দেয়া থাকে তা হচ্ছে সূর্য পুরোপুরি অস্তমিত হওয়ার পরের সময়। সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময় হিসাবে তাই ধরতে হবে পত্রিকা বা আবহাওয়া অফিস থেকে প্রাপ্ত সূর্যাস্তের সময়ের পূর্বের ১৫ মিনিট। অর্থাৎ সূর্যাস্তের সময় যদি হয় সন্ধ্যা ৬ঃ৪৫, তাহলে সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময় হবে সন্ধ্যা ৬ঃ৩০ থেকে ৬ঃ৪৫ পর্যন্ত।

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময়কে আগে ২৩ মিনিট ধরা হত। এমন কি বর্তমানেও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ক্যালেন্ডারগুলোতে ২৩ মিনিটের কথাই লিখা হয়ে থাকে। কিন্তু সঠিক নিষিদ্ধ সময় হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। যা আলেমগণ গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। তাই বর্তমানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময়কে ২৩ মিনিটের স্থলে ১৫ মিনিট ধরা হয়। তবে কেউ যদি ২৩ মিনিট ধরে আমল করে তাহলে তা অধিক সতর্কতাযুক্ত হবে।

মাগরিবের নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

সূর্য পুরোপুরি অস্তমিত হওয়ার পর ইফতার ও মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হয়। মাগরিবের ওয়াক্ত থাকে ইশার ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত। মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার জন্য নির্দেশক আলামত হচ্ছে শাফাক অদৃশ্য হওয়া। শাফাক অদৃশ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত মাগরিবের ওয়াক্ত বাকি থাকে। এতে কোনো ইমামের মধ্যে মতপার্থক্য নাই। কিন্তু শাফাকের সংজ্ঞা নিয়ে ইমামদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।

হানাফী মাজহাবের ফতোয়া হচ্ছে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে লালিমা দেখা যায়, সেই লালিমা শেষ হওয়ার পর সাদা ভাব আসে। এই সাদা ভাবটিই শাফাক। এই সাদা ভাবটি যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ মাগরিবের ওয়াক্ত থাকে। এরপর আকাশ কালো হতে শুরু করে। সাদা ভাব চলে গিয়ে যখন পশ্চিম আকাশ কালো হতে শুরু করে তখনই মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়। অন্যান্য মাজহাবের ফতোয়া হচ্ছে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে থাকা লালিমাই শাফাক। অর্থাৎ তাদের মতে উক্ত লালিমা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই মাগরিবের ওয়াক্ত থাকে। লালিমা চলে গিয়ে সাদা ভাব আসলে মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়।

ঘড়ির কাটার হিসাবে হানাফী মাজহাবের ফতোয়া অনুযায়ী মাগরিবের ওয়াক্তের সময়সীমা সোয়া ১ ঘন্টা থেকে দেড় ঘন্টা। যা ঋতুভেদে পরিবর্তন হয়। আমাদের সমাজে লোকমুখে প্রচলিত আছে “মাগরিবের ওয়াক্ত ১৫-২০ মিনিটের বেশি থাকে না”। কথাটি সঠিক নয়। বরং সঠিক কথা হচ্ছে মাগরিবের ওয়াক্ত ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট থেকে প্রায় ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত থাকে। যদিও নামাজ এত দেরি করে পড়া মাকরুহ। কোনো কারণবশত শুরুর দিকে মাগরিব আদায় না করে থাকলে শেষ সময়ে সুযোগ হলে তখনই পড়ে নিতে হবে। ওয়াক্ত শুরুর ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে নামাজ পড়তে না পারলে অনেকে মাগরিব ছেড়ে দেন বা পরে ইশার সাথে কাজা আদায় করেন। যা নামাজের ওয়াক্ত না জানার ফল। আমাদের অ্যাপের ব্যবহারকারীদের থেকে সবচেয়ে যেই কমন প্রশ্নটি আমরা পাই তা হচ্ছে মাগরিবের ওয়াক্ত নিয়ে। অসংখ্য মানুষকে গত কয়েক বছরে উত্তর দিতে হয়েছে মাগরিবের ওয়াক্ত আদৌ এত সময় থাকে কিনা। আশা করি এর মাধ্যমে আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারনার অবসান হবে ইনশাআল্লাহ।

মাগরিবের নামাজের উত্তম সময়

মাগরিবের সালাতের উত্তম সময় হচ্ছে ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে। কিন্তু রামাদান মাসে কিছুটা বিলম্বে পড়া উত্তম যেন ইফতার করে নেয়া যায়। কারণ ইফতার করে নিলে ধীরস্থির ভাবে খুশুখুযুর সাথে সালাত আদায় করার সম্ভাবনা বাড়ে। এজন্য সালাতের সময় খাবার উপস্থিত হলে সম্ভব হলে উচিত আগে খাবার খেয়া নেয়া। নইলে ক্ষুধার্থ হলে সালাতের সময় খাবারের কথা বারবার মনে আসতে পারে এবং এতে নামাজের একাগ্রতা নষ্ট হতে পারে। তাই রোজা রাখলে ইফতার করে এরপর মাগরিব আদায় করব, অন্য সময় ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথেই আদায় করব ইনশাআল্লাহ।

মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী (আওয়াবিন) নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

নবী (সা) মাগরিব ও ইশার সালাতের মাঝের সময়টিতে নফল সালাত আদায় করতেন। এ সালাতকে আওয়াবিন সালাত বলা হয়েছে। যদিও যে হাদীসের আলোকে একে আওয়াবিনের সালাত বলা হয়েছে সে হাদীসের বর্ণনা সূত্র নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে আপত্তি রয়েছে। অত্যন্ত যঈফ বা দুর্বল বর্ণনা সূত্রের কিছু হাদীসে পাওয়া যায় এ সময়ে ৬ বা ২০ রাকাত সালাত আদায় ও তার ফজিলতের ব্যাপারে। কিন্তু কোনো সহীহ সূত্রে এরকম রাকাত সংখ্যা বা এই সালাতের বিশেষ ফজিলতের বর্ণনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। সহীহ বর্ণনাসূত্রের হাদীসে পাওয়া যায় নবীজি (সা) কখনো কখনো মাগরিব থেকে ইশার পুরোটা সময়েই নফল সালাত আদায় করেছেন। তাই আমরা সাধ্য মত যত বেশি পারি এই সময়ে সালাত আদায় করব। ৬ বা ২০ সংখ্যাকে চূড়ান্ত রাকাত সংখ্যা হিসাবে নির্ধারন করব না। তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী (রহ) মাগরিবের ও ইশার মধ্যবর্তী এই সালাতকে রাতের সালাত বা তাহাজ্জুদ হিসাবে গণ্য করতেন। এই সালাতের কোনো বিশেষ নিয়ম বা বিশেষ সূরা পড়ার বিধান নাই। অন্যান্য যে কোনো নফল-সুন্নত নামাজের মত ২ রাকাত করে যত ইচ্ছা পড়তে পারি।

ইশার নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পরপর তথা শাফাক অদৃশ্য হয়ে গেলে ইশার ওয়াক্ত শুরু হয়। হানাফী মাজহাবের মত হচ্ছে ইশার ওয়াক্ত শেষ হয় ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ সুবহে সাদিকের সময় বা সাহরির শেষ সময়ের পরেই ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। সাহরির শেষ সময়ের অর্থাৎ সুবহে সাদিক উদিত হলে ইশার ওয়াক্ত শেষ হয়। ইশার ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। এটা হানাফী ফিকহ এর মত। তবে মধ্যরাতের পর ইশার সালাত আদায় করা মাকরুহ। কোনো বিশেষ প্রয়োজন বা একান্ত বাধ্য হওয়া ছাড়া কেউ নিয়মিত ইশার সালাত মধ্যরাতের পর আদায় করলে তিনি গুনাহগার হবেন।

হানাফী মাজহাব ব্যতীত অন্যান্য মাজহাবের ইমামগণের অভিমত হচ্ছে ইশার সালাতের ওয়াক্ত শেষ হয় মধ্যরাতে। মধ্যরাত বললে অনেকে মনে করে থাকেন রাত ১২টা। কিন্তু এখানে মধ্যরাত বলতে রাত ১২টা উদ্দেশ্য নয়। মধ্যরাত রাত কয়টায় হয় তা বের করার সূত্র হচ্ছে সূর্যাস্তের সময় থেকে পরবর্তী সুবহে সাদিকের সময়কে যোগ করুন। এরপর ২ দ্বারা ভাগ করলে যত সময় হয়, সূর্যাস্তের পর থেকে ঠিক তত সময় পরই মধ্যরাত। যেমনঃ আজকের সূর্যাস্ত যদি হয়ে থাকে সন্ধ্যা ৬ঃ৪৫ এ আর সুবহে সাদিক যদি হয়ে থাকে ভোর ৩ঃ৪৫ এ। তাহলে হিসাব করে বের করতে হবে মোট time duration. সন্ধ্যা ৬ঃ৪৫ থেকে শেষ রাত ৩ঃ৪৫ পর্যন্ত সময়ের দৈর্ঘ্য পাওয়া যায় মোট ৯ ঘন্টা। অতএব মধ্যরাত হবে সূর্যাস্তের সময় থেকে ৯ এর অর্ধেক (সাড়ে ৪ ঘন্টা) সময় পর। অর্থাৎ আজকের মধ্যরাত হবে রাত ১১ঃ১৫ তে। এভাবে আপনি চাইলে যে কোনো দিনের ইশার শেষ সময় মধ্যরাত অনুযায়ী বের করতে পারবেন। এটা শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী মাজহাবের ফতোয়া।

ইশার শেষ সময় নিয়ে যেহেতু ফিকহী ইখতিলাফ (মতপার্থক্য) রয়েছে তাই আপনি যে মাজহাবের ফিকহ অনুসরন করেন সে অনুযায়ী আমল করবেন। দেশের বাইরের অ্যাপগুলো বা গুগল সার্চ করলে সাধারনত হানাফী মাজহাব অনুযায়ী নামাজের ওয়াক্ত দেখানো হয় না। তাই আমাদের মুসলিমস ডে অ্যাপের ইশার ওয়াক্তকে সেগুলোর সাথে compare করে অনেকে আমাদের অ্যাপকে ভুল মনে করেন। আসলে এটি ভুল নয়। আমাদের অ্যাপে বাই ডিফল্ট হানাফী মাজহাব সেট করা থাকে। যেহেতু দেশের বেশির ভাগ মানুষ হানাফী ফিকহ অনুসরণ করেন। কিন্তু আপনি ভিন্ন মাজহাবের অনুসারী হলে অ্যাপের সেটিংস থেকে মাজহাব পরিবর্তন করে নিতে পারেন। তাহলে আপনাকে মধ্যরাত পর্যন্ত ইশার ওয়াক্ত দেখানো হবে।

ইশার নামাজের উত্তম সময়

রাতের প্রথম এক তৃতীয়াংশের শেষ ভাগে ইশার সালাত আদায় করা উত্তম। কিন্তু মহল্লার মসজিদের জামায়াত যদি অতটা বিলম্ব না হয় সেক্ষেত্রে এই উত্তম সময়ে আদায়ের লক্ষ্যে বাড়িতে একাকী সালাত আদায় করা যাবে না। বরং জামায়াতকেই প্রাধান্য দিতে হবে। রাতের এক তৃতীয়াংশের হিসাবটিও মধ্যরাত নির্ণয়ের অনুরূপ। অর্থাৎ সূর্যাস্তের সময় থেকে সাহরির শেষ সময় তথা সুবহে সাদিকের সময় পর্যন্ত মোট সময় বের করতে হবে। এরপর তাকে ৩ দিয়ে ভাগ দিলে যে time duration পাওয়া যাবে। সূর্যাস্তের সময় থেকে সেই পরিমাণ সময়ই হচ্ছে রাতের এক তৃতীয়াংশের শেষ ভাগ।

উদাহরণঃ সূর্যাস্ত যদি সন্ধ্যা ৬ঃ৪৫ এ আর সুবহে সাদিক বা সাহরির শেষ সময় যদি হয় রাত ৩ঃ৪৫। তাহলে এই দুই সময়ের পার্থক্য ৯ ঘন্টা। একে ৩ দিয়ে ভাগ দিলে পাওয়া যায় ৩ ঘন্টা। অর্থাৎ ইশার উত্তম সময় হবে রাত ৯ঃ৪৫ এ। যাদের উপর জামায়াতে নামাজ ওয়াজিব নয় তাদের চেষ্টা করা উচিত ইশার সালাতটা উত্তম সময়ে পড়ার।

বিতর নামাজের উত্তম সময়

বিতরের সালাত তাহাজ্জুদের মত রাতের শেষ ভাগে পড়া উত্তম। যে ব্যক্তির ইচ্ছা থাকে এবং ভরসা থাকে যে সে রাতের শেষ ভাগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়বে। তাহলে ঐ ব্যক্তির জন্য শেষরাতেই তাহাজ্জুদের পরে বিতর আদায় করা উত্তম। কারণ শেষ রাতের সালাতে ফেরেশতাগণ উপস্থিত থাকেন এবং শেষ রাতের বিতরের সালাতই উত্তম।

কিন্তু যে ব্যক্তি শেষ রাতে উঠতে পারবে না বলে আশংকা করে সে অবশ্যই রাতের প্রথমাংশে ইশার সাথে বিতর আদায় করবে। এটাই তার জন্য উত্তম হবে।

তাহাজ্জুদ নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

ইশার সালাতের ওয়াক্তের পর তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শুরু হয়। সুবহে সাদিক বা সাহরির শেষ সময়ের সাথে সাথে তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়।

ইশার সালাতের পর রাত্রে ঘুমানোর পর, ঘুম থেকে উঠে যে সালাত আদায় করা হয় তাকে তাহাজ্জুদ সালাত বলা হয়।

তাহাজ্জুদ নামাজের উত্তম সময়

রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা উত্তম। নবীজি (সা) কখনো মধ্যরাতে কখনোবা তার কিছু আগে বা পরে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে মিসওয়াক করে অযু করতেন এবং তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করতেন। ২ থেকে ১২ রাকাত পর্যন্ত তাহাজ্জুদ সালাত আদায়ের কথা হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে।

তাই আমাদের চেষ্টা থাকা উচিত রাতের শেষ ভাবে যখন সাহরি খাওয়ার জন্য আমরা উঠি। সেই সময়ে তাহাজ্জুদ আদায় করা। যদি তা একান্তই সম্ভব না হয় তাহলে ইশার পর বিতরের নামাজের আগে কয়েক রাকাত সালাত তাহাজ্জুদের নিয়তে পড়লে আশা করা যায় এতেও আল্লাহ তা’য়ালা তাহাজ্জুদের সওয়াব দান করবেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক সময় জেনে সে অনুযায়ী সালাত আদায় করার তাওফিক দান করুন। প্রতিটি সালাত আল্লাহ আমাদেরকে উত্তম সময়ে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

পুনশ্চঃ এই লেখাটি আমার কোনো মৌলিক লেখা নয়। অনলাইন এবং বিভিন্ন বইপুস্তকের থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি নিয়ে একটি সংকলন মাত্র। আমি যে সকল সূত্র থেকে তথ্য নিয়েছি সেগুলো নিচে উল্লেখ রয়েছে। লেখাটির যা কিছু ভাল তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর এর মাঝে যদি কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকে তাহলে তা শয়তানের পক্ষ থেকে এবং আমি ব্যক্তির পক্ষ থেকে। কোনো রকম তথ্যগত ভুল বা অসঙ্গতি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে কমেন্ট করে জানাবেন। আমি চেষ্টা করব সেগুলো ক্রসচেক করে সংশোধন করার জন্য। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেকের অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। আমীন।

তথ্যসূত্র

  1. দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম – ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রকাশকালঃ জুন ২০০০
  2. ফিকহুস সুনানি ওয়াল আছার – আল্লামা মুফতি সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম প্রকাশ, অক্টোবর ২০১০)
  3. সুবহে সাদিক ও ফজরের সময় কখন শুরু? : একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর – মাসিক আলকাউসার
  4. সূর্যোদয়ের কয়েক মিনিট আগে নামাজ – iFatwa
  5. আসরের নামাজ প্রসঙ্গে – iFatwa
  6. সূর্যোদয়ের সময় ফজরের নামায এবং সূর্যাস্তের সময় আছরের নামাযের মধ্যকার পার্থক্য – iFatwa
  7. মাগরিবের সালাতের ওয়াক্ত – মাসিক আলকাউসার
  8. মাগরিবের ওয়াক্ত কত সময় থাকে? – মাওলানা মামুনুল হক
  9. মাগরিবের ওয়াক্ত কত সময় পর্যন্ত থাকে? – মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাশার
  10. এশার সালাতের ওয়াক্ত – মাসিক আলকাউসার
  11. ফজরের নিষিদ্ধ সময়ের পরিমাণ – ইসলামী জিন্দেগী
  12. নামাযের ওয়াক্ত – মুফতি মনসূরুল হক

6 thoughts on “ফরজ ও নফল নামাজের ওয়াক্ত বা সময়সীমা

  1. এই আর্টিকেলে সূর্যোদয়ের পর নিষিদ্ধ সময় ১৫ মিনিট বলা হলেও অ্যাপের সময়সূচিতে নিষিদ্ধ সময় ২৩ মিনিট দেখানো হয়েছে। বস্তুত ১০ মিনিট পরেই সূর্য পরিপূর্ণভাবে উদিত হয়ে যায় এবং এর পর আর নিষিদ্ধ সময় থাকে না।

    1. অ্যাপের পরবর্তী ভার্সনে নিষিদ্ধ সময় ১৫ মিনিট পাওয়া যাবে। অ্যাপের বেটা ভার্সনে অলরেডি ১৫ মিনিট দেখানো হচ্ছে। বেটা টেস্টিং শেষ হলে মূল অ্যাপে ১৫ মিনিটের ফিচারটি আপডেট দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *