পোস্টটি পড়া হয়েছে 331 বার
জুমার দিনের আমল

জুমআর দিনের সুন্নাহ ভিত্তিক কিছু আমল

প্রতিটি মুসলিমের নিকট জুমআ তথা শুক্রবার একটি কাঙ্ক্ষিত দিন। এটি মু’মিনের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসাবে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। নবীজি (সা) কর্তৃক এই দিনটির ফজিলত ও বেশ কিছু আমল সাব্যস্ত হয়েছে। সেগুলো থেকে কিছু আমলের বিষয়ে আজকের এই পোস্টে আলোকপাত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

জুমআর দিনে হাদিসে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল

হাদীস শরীফের বিশাল ভান্ডার থেকে অনেকগুলো হাদীস পাওয়া যায় জুমআর দিনের আমলগুলোর ব্যাপারে। সেখান থেকে নিচের এই আমলগুলো সন্নিবেশ করা হয়েছে। কিছু কিছু আমলের রেফারেন্সের হাদীস নিচের লিস্টের পরে ফজিলতের হাদীস সমূহের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিচে জুমআর দিনের ১২টি আমল পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলোঃ

  1. গোসল করা।
  2. ফজরের ফরজ নামাজে সূরা সাজদা ও সূরা দাহর/ইনসান তিলাওয়াত করা।
  3. উত্তম পোশাক পরা।
  4. সুগন্ধি ব্যবহার করা।
  5. আগেভাগে মসজিদে যাওয়া।
  6. সূরা কাহফ তেলাওয়াত করা। (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত থেকে শুক্রবার সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত যে কোনো সময়ে)
  7. জুমআ’র সালাতে মসজিদে গিয়ে কমপক্ষে দুই রাকাত সালাত আদায় করা।
  8. ইমামের কাছাকাছি গিয়ে বসা।
  9. মনযোগ দিয়ে খুৎবা শোনা। খুৎবা চলাকালে কোনো কথা না বলা।
  10. দুই খুৎবার মাঝের সময়ে বেশি বেশি দুয়া করা।
  11. অন্য সময়ে দুয়া করা। কারণ এদিন দু’আ কবুল হয়।
  12. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সারাদিন যথাসম্ভব বেশি দরূদ পাঠ করা।

জুমআর দিনের ফজিলত সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস

জুমআর দিনের অনেক ফজিলত হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্য থেকে কয়েকটি ফজিলত ও রেফারেন্স হাদীস নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রতি কদমে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের নফল সালাতের সওয়াব

জুমআর দিন ৫টি কাজের মাধ্যমে জুমআর নামাজে অংশ নিলে আল্লাহ তায়ালা বান্দার প্রতি কদমে কদমে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের নফল সালাতের সওয়াব দান করেন। সুবহানাল্লাহ!!! অর্থাৎ কারো বাসা থেকে মসজিদের দূরত্ব যদি ১০০ কদম হয়, তাহলে এই পাঁচটা কাজ করলে সে ব্যক্তি ১০০ বছর নফল রোজা ও ১০০ বছর নফল সালাতের সওয়াব পেয়ে যাবে। পাঁচটি কাজ হচ্ছেঃ

  1. গোসল করা
  2. আগে আগে মসজিদে আসা
  3. পায়ে হেটে মসজিদে আসা
  4. ইমামের কাছাকাছি বসা
  5. অনর্থক কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা

আওস ইবনু আওস আস-সাক্বাফী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে বলতে শুনেছিঃ

যে ব্যক্তি জুমু’আহ্‌র দিন গোসল করবে এবং (স্ত্রীকেও) গোসল করাবে, প্রত্যুষে ঘুম থেকে জাগবে এবং জাগাবে (সকাল-সকাল ও আগে-আগে (মসজিদে যাওয়ার জন্য) প্রস্তুত হবে), জুমু’আহ্‌র জন্য বাহনে চড়ে নয় বরং পায়ে হেঁটে মাসজিদে যাবে এবং কোনরূপ অনর্থক কথা না বলে ইমামের নিকটে বসে খুতবা শুনবে, তার (মাসজিদে যাওয়ার) প্রতিটি পদক্ষেপ সুন্নাত হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে সে এক বছর যাবত সিয়াম পালন ও রাতভর সলাত আদায়ের (সমান) সাওয়াব পাবে।

(হাদীসের মানঃ সহীহ। আবু দাউদ ৩৪৫)

জুমআর দিন সূরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত

হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের সাথে সাথেই শুক্রবার শুরু হয়ে যায়। তাই বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে পরদিন শুক্রবার সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত যে কোনো সময়ে সূরা কাহফ তিলাওয়াতের অনেক ফজিলত রয়েছে। নিচে কয়েকটি হাদীস তুলে ধরা হলো।

জুমার দিন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করলে কিয়ামতের দিন আলো দিবে এবং ২ জুমআর মাঝের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“যে ব্যক্তি শুক্রবার দিন সূরা কাহাফ পাঠ করবে তার পা থেকে আকাশের উচ্চতা পর্যন্ত নূর (আলো) হয়ে যাবে, যা কেয়ামতের দিন আলো দিবে এবং বিগত জুমা থেকে এ জুমা পর্যন্ত তার সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।”

(আত তারগীব ওয়া তারহীব: ১/২৯৮)

জুমআর দিন সূরা কাহফ তিলাওয়াত করলে এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত আলোকোজ্জ্বল হবে।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ পড়বে তার জন্য এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত আলোকোজ্জ্বল হবে।“

(মুসতাদারেক হাকিম: ২/৩৯৯, বায়হাকী: ৩/২৪৯, ফয়জুল ক্বাদীর: ৬/১৯৮)

সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করলে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্ত থাকা যাবে। এটি যে কোনো সময়ের জন্য প্রযোজ্য। শুধু জুমআর দিনের জন্য নির্দিষ্ট নয়।

আবু দারদা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

‘‘যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দিক থেকে দশটি আয়াত মুখস্থ করবে, সে দজ্জালের (ফিতনা) থেকে পরিত্রাণ পাবে।’’

(সহীহ মুসলিম)

জুমআর দিন গোসল করা, উত্তম পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহারের ফজিলত

আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

যে ব্যক্তি জুমুআহ্‌র দিন উত্তমরূপে গোসল করে, উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, তার উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং আল্লাহ তার পরিবারের জন্য যে সুগন্ধির ব্যবস্থা করেছেন, তা শরীরে লাগায়, এরপর জুমুআহ্‌র সলাতে এসে অনর্থক আচরণ না করে এবং দু’জনের মাঝে ফাঁক করে অগ্রসর না হয়, তার এক জুমুআহ থেকে পরবর্তী জুমুআহ্‌র মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহমসূহ ক্ষমা করা হয়।

(সুনানে ইবনে মাজাহ ১০৯৭)

আগে আগে মসজিদে যাওয়ার ফজিলত যথাক্রমে উট, গাভী, মুরগি ও ডিম দানকারীর ন্যায়

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

জুমু’আর দিন মসজিদের দরজায় মালাইকা (ফেরেশতাগণ) অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে পূর্বে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার পূর্বে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি মোটাতাজা উট কুরবানী করে। অতঃপর যে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি গাভী কুরবানী করে। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি মুরগী দানকারীর ন্যায়। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি একটি ডিম দানকারীর ন্যায়। অতঃপর ইমাম যখন বের হন তখন মালাইকা (ফেরেশতাগণ) তাঁদের খাতা বন্ধ করে দিয়ে মনোযোগ সহকারে খুত্‌বা শ্রবণ করতে থাকেন।

(বুখারী ৯২৯)

জুমআর দিনের একটি বিশেষ সময়ে বান্দার যে কোনো দুআ কবুল হয়

জুমআর দিন একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যখন বান্দার সকল চাওয়া আল্লাহ পূরণ করেন। আলেমদের মধ্যে সে সময়টি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো আলেমের মতে সেই সময়টি হচ্ছে দুই খুতবার মাঝের সময়। কোনো কোনো আলেম বলেন আসরের পর থেকে মাগরিবের আগ পর্যন্ত। আমাদের উচিত এই দুই সময়ে বিশেষ ভাবে দুআ করা। একই সাথে দিনের যখনই সুযোগ পাওয়া যায় দুআ করা।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমআ’র দিনের উল্লেখ করে বললেন, ‘এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যে, কোন মুসলিম বান্দা যদি এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নামায পড়া অবস্থায় আল্লাহ্ নিকট কোন কিছু চায়, তাহলে তিনি তাকে অবশ্যই তা দান করেন। আর তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত।’

(বুখারী ৯৩৫, মুসলিম ৮৫২)

যে অনর্থক কাজগুলো জুমআর সওয়াবকে বরবাদ করে দিবে

খুতবার সময় খুতবা শোনা ছাড়া সকল প্রকার অপ্রয়োজনীয় কাজ অহেতুক কাজের অন্তর্ভুক্ত। আর অহেতুক বা অনর্থক কাজ জুমআর সওয়াবকে নষ্ট করে দিবে। নিচে কয়েকটি অহেতুক কাজের উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

  1. খুতবার সময় কথা বলা
  2. পাশের কেউ কথা বলতে থাকলে তাকে কথা বলতে নিষেধ করা
  3. মোবাইল ফোনে কোনো কাজ করা
  4. মসজিদের দানবাক্স চালানো
  5. মসজিদের জন্য দান উঠানোর জন্য রুমাল-জায়নামাজ ইত্যাদি ব্যবহার করে ঘুরে ঘুরে দান তোলা
  6. উপস্থিত মুসল্লিগণকে ডিঙ্গিয়ে বা দুই জনের মাঝে ফাঁকা করে সামনে অগ্রসর হওয়া

পরে থাকা একটা পাথর বেখেয়ালে স্পর্শ করাও একটি অনর্থক কর্ম

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওযূ করল, অতঃপর জুমআর নামাজ পড়তে এল এবং মনোযোগ সহকারে নীরব থেকে খুতবাহ শুনল, সে ব্যক্তির এই জুমআ ও (আগামী) জুমআর মধ্যেকার এবং অতিরিক্ত আরো তিন দিনের (ছোট) পাপসমূহ মাফ করে দেওয়া হল। আর যে ব্যক্তি (খুৎবাহ্ চলাকালীন সময়ে) কাঁকর স্পর্শ করল (অর্থাৎ বেখেয়ালে একটা পরে থাকা পাথর স্পর্শ করল), সে অনর্থক কর্ম করল।’’ (অর্থাৎ সে জুমআর সওয়াব বরবাদ করে দিল।)

(মুসলিম)

পাশের সাথীকে চুপ করতে বললেও তা একটি অনর্থক কাজ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

জুমু’আর দিন যখন তোমার পাশের মুসল্লীকে চুপ থাক বলবে, অথচ ইমাম খুত্‌বা দিচ্ছেন, তা হলে তুমি একটি অনর্থক কথা বললে।

(বুখারী ৯৩৪)

উপস্থিত মুসল্লিদেরকে ডিঙ্গিয়ে সামনে যাওয়া অনর্থক কাজ

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ জুমুআহ্‌র দিন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর খুতবারত অবস্থায় এক ব্যক্তি মাসজিদে প্রবেশ করলো। সে লোকের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে দিকে যাচ্ছিল। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তুমি বসো, তুমি (অন্যকে) কষ্ট দিয়েছ এবং অনর্থক কাজ করেছ।

(সুনানে ইবনে মাজাহ ১১১৫)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রতিটি জুমআর ফজিলত হাসিল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

রেফারেন্স

  1. জুমআর দিনের ১১ টি আমল – শায়খ আহমাদুল্লাহ
  2. শুক্রবারের যে আমলে হাজার বছরের নফল রোজা ও নফল নামাজের সওয়াব – শায়খ আহমাদুল্লাহ
  3. একটি অনর্থক কাজ – খুতবা চলাকালীন দানবাক্স চালানো – মাসিক আলকাউসার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *