পোস্টটি পড়া হয়েছে 2,754 বার
শাওয়ালের ৬ রোজাকে সাক্ষী রোজা বলা যাবে না

শাওয়ালের ছয়টি রোজার ফজিলত ও বিধান – [এটি সাক্ষী রোজা নয়]

আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর দরবাকে শুকরিয়া আদায় করছি এজন্য যে তিনি তার সন্তুষ্টির জন্য আমাদেরকে আমল করার তাওফিক দিয়েছেন। তিনি অসংখ্য উপায় বলে দিয়েছেন যেগুলোর মাধ্যমে আমরা তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে পারি। একই সাথে যেগুলোর মাধ্যমে আমরা দুনিয়ার জীবনেও প্রশান্তি ও সুখী জীবন যাপন করতে পারি। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সাওম বা রোজা। রমাদানের এক মাস রোজা আদায়ের পর আল্লাহ আমাদের জন্য শাওয়ালের রোজার ব্যবস্থা করেছে দিয়েছেন। যেন আমরা বাড়তি কিছু অফার লাভ করতে পারি।

আমাদের দেশের অনেক মানুষই শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রেখে থাকেন। শাওয়ালের এই ৬ টি নফল রোজা রাখার ব্যাপারে অনেকগুলো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

যেহেতু বছরে একবারই আমরা এই রোজাগুলো রেখে থাকি তাই এ সংক্রান্ত বিধিবিধানগুলো ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। পরবর্তী বছরে আমার নিজের জন্য এবং একই সাথে যারা আমার ব্লগে নিয়মিত আসেন তাদের রেফারেন্সের জন্য এ সংক্রান্ত তথ্যাদি একত্রিত করার চেষ্টা করব।

শাওয়ালের ছয় রোজা রাখার ফজিলত

শাওয়ালের ৬ রোজা রাখার ফজিলতের ব্যাপারে বেশ কিছু সহীহ হাদীস পাওয়া যায়। রমাদানের রোজা পূর্ণ করার পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব হাসিল হবে।

আবূ আইয়ূব আল আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

রমাযান মাসের সিয়াম পালন করে পরে শাও্ওয়াল মাসে ছয়দিন সিয়াম পালন করা সারা বছর সওম পালন করার মত।

মুসলিম ২৬৪৮, হাদীসের মানঃ সহীহ

একই অর্থে হাদীসটি বিভিন্ন সাহাবী বর্ণনা করেছেন এবং সেগুলো বিভিন্ন হাদীসের কিতাবে সংকলিত হয়েছে। নিচে আরেকটি হাদীস উল্লেখ করা হলো।

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মুক্ত দাস সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পর ছয় দিন সিয়াম রাখলো, তা পূর্ণ বছর সিয়াম রাখার সমতুল্য।

“কেউ কোন সৎকাজ করলে, সে তার দশ গুণ পাবে” (সূরা আনআমঃ ১৬০)।

সুনানে ইবনে মাজাহ ১৭১৫, হাদীসের মানঃ সহীহ

ইমাম নববী (রহ) সারা বছর সওয়াব পাওয়ার বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, সূরা আনআমের ১৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে কোনো বান্দা সৎ কাজ করলে তার সওয়াবকে আল্লাহ দশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দিবেন। সে হিসাবে রমাদানে ৩০ টি রোজা রাখা হলে এর দশ গুণ হয় ৩০০। আর শাওয়ালের ৬ টি রোজা রাখা হলে এর দশ গুণ হয় ৬০। উভয়টি যোগ করলে হয় ৩৬০ দিন। যা প্রায় এক বছরের দিন সংখ্যার সমান। উল্লেখ্য, হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছর হয় মোটামুটি ৩৫৪ দিনে। 

শাওয়ালের ৬ টি রোজা রাখার বিধান

প্রথমেই আমরা জেনে নিব শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়াম পালনের হুকুম কী? অর্থাৎ এই রোজাগুলো কি ফরজ, ওয়াজিব নাকি নফল? এ রোজা রাখতে না পারলে কি কোনো ক্ষতি বা গুনাহের আশংকা আছে? শাওয়ালের ছয়টি রোজা না রাখলে কি রমজানের রোজা কবুল হবে না? ইত্যাদি প্রশ্নগুলোর জবাব নিচে তুলে ধরা হলো।

শাওয়াল মাসের ৬টি রোজা কি ফরজ বা ওয়াজিব? এ রোজা না রাখলে কি গুনাহ হবে?

সকল ওলামাদের মতেই শাওয়াল মাসের এই ছয়টি রোজা রাখা সুন্নত বা নফল পর্যায়ের। এটি আমাদের জন্য mandatory করা হয় নাই। বরং এই রোজাগুলো আমাদের জন্য recommended. অর্থাৎ এগুলো রাখার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে। রাখতে পারলে খুবই ভাল। কিন্তু কেউ কোনো কারণবশত বা এমনিতেই কোনো কারণ ছাড়াই যদি এই রোজা না রাখেন। তাহলে তার কোনো গুনাহ হবে না। কারণ এই রোজাগুলোর বিধান ফরজ বা ওয়াজিব নয়। ফরজ বা ওয়াজিব ছেড়ে দিলে গুনাহ হয়। কিন্তু নফল ছেড়ে দিলে গুনাহ হয় না।

তাই সংক্ষেপে বলা যায়, এ রোজাগুলো আদায় করলে আমরা অনেক সওয়াবের অধিকারী হব। কিন্তু কেউ যদি এগুলো না রাখে, তাহলে তার জন্য কোনো গুনাহ নাই। বা তার অন্য কোনো ক্ষতিরও আশংকা নাই।

শাওয়ালের ৬ রোজা রাখার নিয়ম

রমাদানের রোজা যেভাবে রাখি, শাওয়ালের রোজাও সেই একই ভাবে রাখতে হবে। অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও অন্যান্য যে সকল কাজ থেকে বিরত থাকার নিয়ম রমাদানে পালন করি। ঠিক একই ভাবে শাওয়ালের রোজাগুলোও পালন করতে হবে। তবে সুবহে সাদিকের বিষয়ে একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ রমাদান মাসে আমরা মসজিদের মাইক থেকে শুনতে পাই সাহরি শেষ হওয়ার ঘোষণা। সাহরির সময় শেষ হওয়ার ৬ মিনিট পর রমাদান মাসে মসজিদে আজান হয়। কিন্তু রমাদান ছাড়া বছরের অন্য সময়ে ফজরের আজান সুবহে সাদিক হওয়ার বেশ কিছু সময় পরেও হতে পারে। তাই কেউ যেন আমরা সাহরির শেষ সময় হিসাবে আজানকে বেছে না নিই। আজান পর্যন্ত সাহরি খেলে রোজা শুদ্ধ হবে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আমার ব্লগের এই লেখাটি পড়তে পারেন

শাওয়াল মাসের নফল রোজা সহ সারা বছরের যে কোনো সময়ে রোজা রাখার জন্য সুবহে সাদিকের তথা সাহরির শেষ সময় জানার প্রয়োজন হয়। বিশ্বের যে কোনো স্থান থেকে সারা বছরের যে কোনো দিনের সাহরি ও ইফতারের সময়সূচী জানতে পারবেন আমাদের ডেভেলপ করা Muslims Day Android App এর মাধ্যমে। এর সাহায্যে জানা যাবে আজকের সাহরির শেষ সময় ও আজকের ইফতারের সময়। অর্থাৎ যেদিন অ্যাপটি ওপেন করা হবে সেদিনের সময়টিই অ্যাপের হোম পেজে দেখা যাবে। তাই যারা নফল রোজা রাখেন তাদের জন্য এই অ্যাপটি উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ।

শাওয়ালের রোজাগুলো রাখার দিন – এক টানা রোজা রাখব নাকি ভেঙে ভেঙে রাখব?

শাওয়ালের ২ তারিখ অর্থাৎ ঈদের পরদিন থেকে শাওয়ালের শেষ দিনের মধ্যে যে কোনো ৬ দিন রোজা রাখলেই এই ছয়টি রোজা আদায় হয়ে যাবে। আপনার যেভাবে রাখলে সুবিধা হয় সেভাবে রাখতে পারেন। এক টানা ৬ দিন রাখতে পারেন। সপ্তাহে ২-৩ টা করে রাখতে পারেন। এক দিন পরপর বা দুই দিন পরপর। যেভাবে ইচ্ছা রাখতে পারেন।

সাহরি না খেলে কি রোজা হয়?

আমাদের অনেকের মনেই এই প্রশ্ন আসে যে সাহরি না খেলে কি রোজা হয় কিনা? এ ব্যাপারে সকল ওলামাগণ একমত যে, সাহরি খাওয়া সুন্নাহ ও বরকতের। কিন্তু সাহরি না খেলেও রোজা আদায় হয়ে যাবে। সাহরি না খেলে একটি সুন্নাহ আদায় করা থেকে আমরা বঞ্চিত হই। কিন্তু এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। রমাদান মাসে সাহরিতে কেউ উঠতে না পারলে সাহরি করা ছাড়াই রোজা রাখতে হবে। সাহরি খেতে না পারার কারণে রমাদানের রোজা বাদ দেয়া বা ভেঙে ফেলা যাবে না। কারণ এটা ফরজ রোজা।

শাওয়ালের এই রোজাগুলো রাখার সময় আমরা চেষ্টা করব অন্তত ১ টা খেজুর বা এক গ্লাস পানি খেয়ে হলেও সাহরি খাওয়া। তাহলে একটি সুন্নাহের উপর আমল করা হল আর বরকতও লাভ হল। কিন্তু কেউ যদি সাহরির সময় উঠতে সক্ষম না হন তাহলে তিনি সাহরি না খেয়েও যে কোনো রোজা রাখতে পারবেন। রোজার কোনো ক্ষতি হবে না।

শাওয়ালের ছয় রোজার নিয়ত

আমরা জানি রোজার নিয়ত করা ফরজ। এজন্য অনেকে পেরেশান হন যে শাওয়ালের রোজার নিয়ত কী হবে? রমজানের রোজার নিয়ত হিসাবে অনেকে “নাওয়াইতুআন আসুমা গাদাম্মীন সাহরি…” এই আরবি বাক্যগুলো পড়েন। এই আরবি বাক্যগুলো রাসূল (সা) নিজে পড়েন নি। তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে এই বাক্যগুলো শিক্ষা দেন নি। সাহাবিগণও নিজেরা পড়েন নি। পরবর্তীতে তাবেয়ীগণকেও সাহাবীগণ এই বাক্যটি শিক্ষা দেন নি। অর্থাৎ ইসলামের প্রথম ৩ মুবারক প্রজন্মে এই বাক্য পড়ার প্রচলন ছিল না। তাঁরা অন্তরে রোজা রাখার intention-কেই নিয়ত বলতেন। নিয়ত মনে মনে ইচ্ছা করার নাম। মুখে পড়ার নাম নিয়ত নয়। নিয়ত করা ফরজ, কিন্তু নিয়ত “পড়া” ফরজ নয়।

এজন্য আপনি এই লেখাটি পড়ে বা আগের থেকে চিন্তা করে রেখেছেন শাওয়াল মাসে রোজা রাখবেন। সেই ইন্টেনশন নিয়ে হয়ত সাহরিতে উঠে কিছু খেলেন। বা রাতে ঘুমানোর সময় চিন্তা করলেন “সাহরিতে উঠতে পারি বা না পারি কাল রোজা রাখব” এটাই আপনার জন্য নিয়ত। রোজা রাখার জন্য আপনাকে মুখে উচ্চারণ করে আরবি কোনো বাক্য বা বাংলায় কোনো নির্দিষ্ট কথামালা আবৃত্তি করা বাধ্যতামূলক নয়। আপনি যদি মুখে এই আরবি বাক্যগুলো উচ্চারণ করে পড়াকে জরুরি মনে করেন তাহলে তা সুস্পষ্ট বিদআত হবে।

নামাজ ও রোজার আরবি নিয়ত পড়াকে অনেকেই জরুরি মনে করেন। নিয়ত সংক্রান্ত বিস্তারিত জানার জন্য আমার ব্লগের এই পোস্টটি পড়তে পারেন।

কাজা রোজা আগে রাখব নাকি শাওয়ালের ছয় রোজা আগে রাখব?

যদি কারো কোনো কারণবশত রমাদানের সবগুলো রোজা রাখা না হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে তিনি প্রথমেই কাজাগুলো আদায় করবেন। এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখবেন। যদি কাজা রোজার সংখ্যা কম হয় আর কাজা আদায় করে এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখার সময় থাকে তাহলে সকল ওলামাই এভাবে রাখার ব্যাপারে মত দিয়েছেন।

কিন্তু কারো যদি কাজা রোজার পরিমাণ বেশি হয়। বা এমন সংখ্যক যে তিনি এগুলো রাখতে গেলে শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখার মত সময় পাবেন না তখন কী করবেন এ নিয়ে আলেমগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। মতপার্থক্যের কারণ হচ্ছে এক্সাক্ট এই সিনারিওতে কী করতে হবে এ সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট হাদীস পাওয়া যায় না। তাই বিভিন্ন হাদীসের আলোকে আলেমগণ ফতোয়া প্রদান করেছেন। তাদের সকলের মত একই না হওয়াটা এই জন্য খুব স্বাভাবিক যে, সকল মানুষের চিন্তাধারা এক রকম নয়। একই কথার একাধিক ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আলেমগণও সেভাবেই তাদের সাধ্যমত নির্ভুল ফতোয়া দেয়ার চেষ্টা করেন।

একটি মত হচ্ছেঃ

কাজার পরিমাণ বেশি হলে সেক্ষেত্রে আগে শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখবে। কারণ শাওয়াল চলে গেলে আর এ রোজা রাখা যাবে না। তাই শাওয়ালের রোজাগুলো আগে রেখে এরপর কাজা আদায় শুরু করবে। যত দ্রুত পারা যায় কাজা আদায় করে ফেলবে। এতে ইনশাআল্লাহ শাওয়ালের রোজা রাখার সওয়াব হাসিল হবে। এই আলেমগণ জোর দিয়েছেন হাদীসের মধ্যে উল্লেখিত শাওয়াল মাসের ব্যাপারে। এজন্য তাদের মত হচ্ছে শাওয়ালের মধ্যেই ছয়টি রোজা রাখলে এই সওয়াব পাওয়া যাবে। কাজাগুলো দুই-একটি বাকি থাকলে প্রয়োজনে পরের মাসে করবে।

অপর মতটি হচ্ছেঃ

প্রথমে কাজা আদায় করতে হবে। এরপর শাওয়ালের রোজা রাখতে হবে। এই মতের পক্ষে যেই আলেমগণ মত দেন তারা জোর দিয়েছে এই কথার উপর যে “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখলো এরপর শাওয়ালের রোজা রাখলো”। অর্থাৎ হাদীসের প্রথম অংশের উপর emphasis দিয়ে রমজানের রোজা পূর্ণ করাকে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। তবে কাজা আদায় করতে গিয়ে  সময় পাওয়া না গেলে শাওয়ালের পরে ছয়টি আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে এই মর্মেও কোনো কোনো ফকীহ মত দিয়েছেন।

যেহেতু এটি একটি ইজতেহাদী মত। আর উভয় আলেমদের মতই হাদীসের উপর ভিত্তি করে নেয়া তাই আপনি যেই আলেম বা যেই মাজহাব অনুসরণ করেন তার উপরই আমল করতে পারেন।

আইয়ামে বীজ বা সোমবার ও বৃহস্পতিবার শাওয়ালের রোজা রাখলে বাড়তি সওয়াব হাসিল হবে কি?

আমরা জানি প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা সুন্নত। আল্লাহর রাসূল (সা) এই রোজাগুলো নিয়মিত আদায় করতেন। এই নফল রোজাগুলোকে বলা হয় আইয়ামে বীজ এর রোজা। এছাড়াও সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার নবী (সা) রোজা রাখতেন। কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন যে সোমবার তাঁর জন্ম বার, তাই এদিন তিনি রোজা রাখেন। আর বৃহস্পতিবার বান্দার আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আর নবী (সা) এমন অবস্থায় তার আমল পেশ করা হোক পছন্দ করতেন যে তিনি ঐদিন রোজা অবস্থায় অর্থাৎ আল্লাহর বিশেষ ইবাদতের অবস্থায় আছেন। তাহলে আমরা বুঝতে পারছি আইয়ামে বীজের ৩ দিন ও সোম-বৃহস্পতিবার রোজা রাখা এমনিতেই সুন্নত।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে শাওয়ালের ছয়টি রোজা যদি আমরা বুদ্ধি করে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রাখি। এবং আইয়ামে বীজের ৩ দিন রাখি তাহলে উভয় হাদীসের উপর আমল করার জন্য আমরা বেশি সওয়াবের আশা করতে পারি কিনা। বেশির ভাগ ওলামাগণের মত হচ্ছে ইনশাআল্লাহ এই দিনগুলোতে রোজা রাখলে উভয় সুন্নাতের উপর আমল করার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে উভয় সুন্নতের সওয়াব আশা করতে পারি। আলেমগণ বলেন, ফরজ বা ওয়াজিবের সাথে নফলকে একই দিনে আদায় করা যাবে না। যেমনঃ কারো কাজা রোজা বাকি আছে, এমন অবস্থায় শাওয়াল মাসে কাজা এবং শাওয়ালের রোজা উভয়টার নিয়তে এক দিনে রোজা রাখা যাবে না। কিন্তু শাওয়ালের রোজা নফল একই সাথে সোম-বৃহস্পতির রোজা বা আইয়ামের বীজের রোজাও নফল। এই বিশেষ দিনগুলোতে শাওয়ালের নফল রোজা আদায় করলে ইনশাআল্লাহ উভয়টাই আদায় হয়ে যাবে।

একই রকম উদাহরণ হচ্ছে তাহিয়্যাতুল উযু ও দুখুলুল মসজিদের ২ রাকাত নামাজের ক্ষেত্রে। কেউ উযু করলো, তখন সে তাহিয়্যাতুল উযুর নামাজ পড়তে পারেন। এটা একটা নফল নামাজ। আবার মসজিদে প্রবেশ করলে দুখুলুল মসজিদ এটাও নফল নামাজ। কেউ যদি উযু করে মসজিদে ঢুকে ২ রাকাত নামাজ পড়েন। তাহলে ওলামাগণ বলেন যে, তার তাহিয়্যাতুল উযু ও দুখুলুল মসজিদ উভয়টাই আদায় হয়ে যাবে। উযু আর মসজিদে প্রবেশের নামাজ আলাদা আলাদা করে পড়তে হবে না।

শাওয়ালের ছয় রোজাকে সাক্ষী রোজা বলা যাবে না – সাক্ষী রোজা বলে ইসলামে কোনো রোজা নাই

শাওয়ালের ছয় রোজাকে সমাজে “সাক্ষী রোজা” বলার প্রচলন রয়েছে। সাক্ষী রোজা এই পরিভাষাটি কুরআন ও হাদীস থেকে পাওয়া যায় না। ইসলামী শরীয়তের জ্ঞানের বিশুদ্ধতম উৎসগুলোতে শাওয়ালের এই রোজাকে সাক্ষী রোজা হিসাবে অভিহিত করা হয় নাই। আমাদের দেশের কিছু মানুষের মনগড়া একটা পরিভাষা বা টার্ম হচ্ছে এই সাক্ষী রোজা।

যারা একে সাক্ষী রোজা বলেন তাদের বিশ্বাস হচ্ছে রমজানের পর এই ছয়টি রোজা রাখা হলে এই ছয়টি রোজা আল্লাহর দরবারে রমজানের রোজা রাখার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিবে। যারা এই কথা বলেন, প্রচার করেন বা বিশ্বার করেন তারা একটা মিথ্যা, বানোয়াট ও জাল কথার উপর বিশ্বাস করেন ও প্রচার করেন। এই রোজা আল্লাহর দরবারে রমজানের রোজার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিলে তার প্রমাণ কুরআন বা হাদীসে পাওয়া যেত। কিন্তু এমন কথা কোনো জাল হাদীসের বইতেও পাওয়া যায় না। তাই আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকে যদিও এটা সাক্ষী রোজা হিসাবে প্রচলিত কিন্তু আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদেরকে এই জাল ও মিথ্যা কথা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ইসলামের আক্বীদা ও বিশ্বাসের উৎস হচ্ছে কুরআন ও হাদীস। যুগ যুগ ধরেও যদি ইসলামের নামে কোনো মিথ্যা কথা প্রচলিত থাকে, সেটা কিন্তু সত্য হয়ে যায় না। আমরা ব্যক্তিগত ভাবে কী মনে করি বা আমাদের পূর্বপুরুষগণ ইসলাম সম্পর্কে যদি ভুল ধারণা পোষণ করে থাকেন সেটা কিন্তু সঠিক হবার পক্ষে কোনো দলীল নয়। তারা ভুল জেনে থাকলে, আমাদেরকেও সত্য সামনে আসার পর মিথ্যাকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে এর কোনো যৌক্তিকতা নাই।

তাই শাওয়ালের এই ছয়টি রোজাকে কোনো ভাবেই সাক্ষী রোজা বলা যাবে না। সাক্ষী রোজার পিছনে যেই আক্বিদা বা বিশ্বাস পোষণ করেন অনেকে সেগুলোও রাখা যাবে না। আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার জাল, মিথ্যা ও বানোয়াট কথা এবং বানোয়াট রেওয়াজ রসম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

শেষ কথা

কোনো আমল কবুল হলো কিনা সেটা বুঝার একটি আলামত আলেমগণ উল্লেখ করেন। তা হচ্ছে ঐ আমলটির continuation বা ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ একটা আমল কবুল হলে সেই আমলটির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার তওফিক আল্লাহ দান করেন বলে অনেক আলেম মনে করেন। আমরা জানি না আমাদের রমাদানের রোজাগুলো কবুল হয়েছে কিনা। তাই আমরা একটু চেষ্টা করে দেখি শাওয়ালের রোজাগুলো রাখতে পারি কিনা। অন্যান্য আরবি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোজাগুলো রাখতে পারি কিনা। তাহলে ইনশাআল্লাহ আমাদের রমাদানের রোজার ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে। হয়ত এর উসিলায় আল্লাহ আমাদের রোজাগুলোকে কবুল করে নিবেন।

আমাদের দেশের অসংখ্য মানুষ ইসলামকে ভালবেসে শবে বরাতের পরদিনের রোজা কত গুরুত্বের সাথে রাখেন। যদিও শবে বরাতের পর দিনের রোজা রাখার হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল সূত্রে বর্ণিত। অনেক মুহাদ্দীস একে জাল হাদীসের পর্যায়ের বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাও আমরা ফজিলতের আমল হিসাবে এ রোজা রাখতে পারি বা রেখে থাকি। অপর দিকে অসংখ্য সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত শাওয়ালের রোজা; প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোজা। আমরা এগুলো কি রাখব না? একটি যয়ীফ বা মাউযু হাদীসের উপর আমল করতে গিয়ে শবে বরাতের পর দিনের রোজা আমরা এত গুরুত্বের সাথে রাখি। সেখানে সহীহ হাদীসগুলোর উপর আমল না করার, কী-ই বা কারণ থাকতে পারে? আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞানের আলোকে বেশি বেশি নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

পুনশ্চ

এই লেখাটি আমার কোনো মৌলিক লেখা নয়। আমি কোনো আলেম বা একাডেমিক ভাবে স্বীকৃত ব্যক্তি নই। বিভিন্ন আলেমদের কথাগুলোকে শুধু এক জায়গায় সংকলিত করেছি। তাই কোথাও কোনো সন্দেহ-সংশয় থাকলে নির্ভরযোগ্য আলেমদের মাধ্যমে যাচাই করে এ লেখাটি গ্রহণ করবেন। এ লেখার মধ্যে যদি কোনো ভাল ও কল্যানকর কিছু থেকে থাকে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। আর যদি কোনো ভুলত্রুটি হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তা আমার পক্ষ থেকে এবং শয়তানের পক্ষ থেকে এসেছে। আল্লাহ আমার ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় কৃত সকল ভুলত্রুটিগুলোকে ক্ষমা করে দিন। আমীন।

রেফারেন্স

আমি যে সকল গুরুত্বপূর্ণ সোর্স থেকে লেখাটি সংকলন করেছি সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

  1. শাওয়ালের রোজা সম্পর্কে ৭টি কমন প্রশ্নের উত্তর – শায়খ আহমাদুল্লাহ
  2. শাওয়ালের ছয়টি রোজা – ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ)
  3. কাজা রোজা আগে রাখা বা শাওয়ালের পরেও নফল রাখার উভয় মত – ড. মনজুরে এলাহী
  4. সাক্ষী রোজা বলে কোনো রোজা ইসলামে নাই – মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক
  5. শাওয়ালের ছয়টি রোজার বিধান ও ফজিলত – মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক

9 thoughts on “শাওয়ালের ছয়টি রোজার ফজিলত ও বিধান – [এটি সাক্ষী রোজা নয়]

  1. গতকাল সেহেরি করেছি শেষ সময় ৪.০৫ মিনিটে। এরপর এপ খুলে দেখি সময় ৩.৪২ এ শেষহয়ে গিয়েছে৷ আজ আমি রোজা আছি। আমি জানিনা এটা কতোটুকু সঠিক হবে। এই সম্পর্কে হাসান ভাইয়া, আপনার জানামতে মতামত আশা করছি৷ সময় না জেনে সেহেরি খাওয়া প্রসঙ্গে৷ আমি কি এই রোজা আবার করবো, নাকি না জেনে রাখায় এটা কাউন্ট করবো। ধন্যবাদ।

    1. আপনি যে সময়ের কথা বলেছেন, তাতে নিশ্চিত যে আপনি সুবহে সাদিক অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার অনেক পর পর্যন্ত সাহরি খেয়েছেন। অতএব রোজাটি হবে না। পুনরায় এটি রাখতে হবে। কারণ রাত আছে মনে করে সাহরি খাওয়া হওয়ার পর যদি দেখা যায় আসলে সুবহে সাদিক হয়ে গিয়েছে, তাহলে ঐ রোজাটি শুদ্ধ হবে না। সাহরি ইফতারের সময় নিয়ে বিস্তারিত জানার জন্য এই পোস্টটি পড়তে পারেন।

      1. জাযাকাল্লাহ অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে,,,
        অ্যাপস টা অনেক উত্তম একটা অ্যাপস, আমি অত্যান্ত খুশি হয়েছি,, এমন একটা অ্যাপস পেয়ে,, আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন,,,
        তবে ভাইজান একটু খেয়াল রাখবেন,,, আহলে হাদিস ভাইদের মত করে সবগুলো হাদিসকে যয়ী,ফ বা দুর্বল মনে করবেন না,,,😍
        এদিকে একটু খেয়াল রাখবেন 🥰
        আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি কে অনুসরণ করলে ইনশাল্লাহ সঠিকভাবে পাবো আমরা,, আশা রাখি, আল্লাহ তাআলা আপনাকে তৌফিক দান করুন,,,,

        1. আহলে হাদীসের ভাইয়েরা সব হাদীসকে যয়ীফ বলেন বলে আমার জানা নাই। ভিন্ন ভিন্ন মুহাদ্দীসের তাহক্বীক ভিন্ন হতে পারে। আমরা হানাফী মাজহাবের অনুসরণ যারা করি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, হাদীস উল্লেখ করার ক্ষেত্রে তা সহীহ না যয়ীফ সেটা এড়িয়ে যাই। উল্লেখ করি না। আমি চেষ্টা করি অ্যাপে কোনো ফজিলতের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীস উল্লেখ করলেও সেটা যে যয়ীফ তা বলে দেয়ার জন্য। আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারের লেকচারে বা লেখা থেকে এ বিষয়ে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। তবে আমরা হানাফীরা যেহেতু হাদীসের ওয়েবসাইট, হাদীসের অ্যাপ এগুলো বানাই না। তাই নির্ভর করতে হয় আহলে হাদীসের ভাইদের খেদমতের উপর। হানাফী ভাইয়েরাও যদি অনলাইন বা ডিজিটাল মিডিয়ায় হাদীসের তাহক্বীক সহ সবগুলো কিতাব এভেইলেবল করতেন তাহলে সেগুলোই অনুসরণ করতাম।

          কোনো হাদীসের ক্ষেত্রে যদি এমন পান যে, শায়খ আলবানীর মতে বা আহলে হাদীস ভাইদের মতে যয়ীফ কিন্তু হানাফী মুহাদ্দীস বা ফকীহদের মতে যয়ীফ নয়। সেক্ষেত্রে কাইন্ডলি আমাকে জানাবেন। আমি সেটাও উল্লেখ করে দেয়ার চেষ্টা করব।

          যে কোনো বিষয়ে অ্যাপে যোগ করার আগে আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারের বক্তব্য খুঁজে বের করে এর বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের চেষ্টা করে থাকি। হাদীসের নামে জালিয়াতি বিষয়ক পোস্টগুলো স্যারের বই এবং মাসিক আলকাউসারের “প্রচলিত ভুল” অপশন থেকে পোস্ট করা হয়ে থাকে।

        2. এপ্স এ বুধবার বৃহস্পতিবার রোজার কথা কেন বলা আছে? ওটা কি সোমবার ও বৃহস্পতিবার হবেনা?

          1. অ্যাপে বুধবার বলা থাকার কারণঃ “হাদীসে বুধবারের কথা বলা আছে”।
            আবু দাউদ ও তিরমিযির রেফারেন্স দেয়া ছিল। একটু কষ্ট করে সার্চ করলেই হাদীসটি পেয়ে যেতেন। হাদীসের মান যয়ীফ, ইমাম তিরমিযি বলেছেন গরীব।

  2. অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই,,পোস্টটি পড়ে অনেক উপকৃত হলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *