পোস্টটি পড়া হয়েছে 18,174 বার
2020 fitra islamic foundation bangladesh

সাদাকাতুল ফিতরের বিধান, পরিমাণ ও কিছু মাসআলা

প্রতি বছর রমাদানের শেষে আমরা যাকাতুল ফিতর প্রদান করে থাকি। যেহেতু এটি বছরে একবার আদায় করে থাকি তাই এর বিধি-বিধান ও মাসআলাগুলো স্বাভাবিক ভাবেই আমরা ভুলে যাই। প্রতি বছরই নতুন করে ফিতরার মাসয়ালাগুলোর খোঁজ করতে হয়। সাদাকাতুল ফিতরের সাথে বা এর মূল্যমানের সাথে ৫ টি পণ্য জড়িত। প্রতি বছর তাই বাজার মূল্যের উপর ভিত্তি করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ২০২০ সালের রমজান মাসেও ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২০২০ সালের ফিতরার জন্য কত টাকা প্রদান করতে হবে সে নির্দেশনা দিয়েছে।

শুরুতেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২০ সাল তথা ১৪৪১ হিজরির রমাদান মাসের ফিতরার পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করা হলো। এরপর ফিতরা বিষয়ক বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

২০২০ সালে ফিতরা কত টাকা?

ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ২০২০ সালের রামাদান মাসের যাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে। এ বছর জনপ্রতি ফিতরা আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ পরিমান ২২০০ টাকা ও সর্বনিম্ন পরিমান ৭০ টাকা।

কেন এই তারতম্য হয়? এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এই আর্টেকেলের পরবর্তী অংশে। পুরোটা পড়লে ইনশাআল্লাহ এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

ইসলামে শরীয়তে ফিতরা দেয়ার জন্য ৫ টি খাদ্যদ্রব্যের উল্লেখ রয়েছে। যে কোনো একটি পণ্য দিয়ে, অথবা আমাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী যে কোনো পণ্যের মূল্য প্রদান করলেও ইনশাআল্লাহ ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। হাদীস শরীফ থেকে প্রাপ্ত এই পণ্যগুলোর বাজারমূল্য অনুযায়ী এ বছরের ফিতরার মূল্য নিচে তুলে ধরা হলোঃ

  1. আটা/গম – ৭০ টাকা
  2. যব – ২৭০ টাকা
  3. কিসমিস – ১৫০০ টাকা
  4. খেজুর – ১৬৫০ টাকা
  5. পনির – ২২০০ টাকা

চলুন দেখে নিই কোন পণ্য দিয়ে ফিতরা আদায়ের জন্য কত মূল্য পরিশোধ করতে হবে।

1. আটা বা গম – ৭০ টাকা

আটা বা গম দিয়ে আদায় করলে অর্ধ সা তথা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম আটা/গম ফিতরা হিসাবে দিতে হবে। এর মূল্য দিতে চাইলে বাজার দর অনুযায়ী আসে ৭০ টাকা।

2. যব – ২৭০ টাকা

যব দিয়ে আদায় করলে ১ সা তথা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম প্রদান করতে হবে। যার বাজারমূল্য ২৭০ টাকা।

3. কিসমিস – ১৫০০ টাকা

কিসমিস দিয়ে আদায় করলে ১ সা তথা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম প্রদান করতে হবে। যার বাজারমূল্য ১৫০০ টাকা।

4. খেজুর – ১৬৫০ টাকা

খেজুর দিয়ে আদায় করলে ১ সা তথা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম প্রদান করতে হবে। যার বাজারমূল্য ১৬৫০ টাকা।

5. পনির – ২২০০ টাকা

পনির দিয়ে আদায় করলে ১ সা তথা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম প্রদান করতে হবে। যার বাজারমূল্য ২২০০ টাকা।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি দেখা যাবে এখান থেকে

ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে আরো বলা হয়েছে পণ্যগুলোর স্থানীয় বাজারমূল্যে তারতম্য হতে পারে। সে অনুযায়ী নিজ নিজ এলাকার বাজারমূল্য অনুযায়ী প্রদান করলেও আদায় হয়ে যাবে। এছাড়াও এখানে পণ্যগুলোর যে মূল্য দেয়া আছে সেগুলোর ক্ষেত্রে পণ্যের মান অনুযায়ী মূল্যের তারতম্যও হওয়া সম্ভব। যেমন ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম খেজুরের মূল্য ধরা হয়েছে ১৬৫০ টাকা। আমরা জানি উন্নত জাতের আজওয়া খেজুরের প্রতি কেজির দামই আছে প্রায় ২০০০ টাকা। সেক্ষেত্রে আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের খেজুরের মূল্যকে আদর্শ না ধরে আজওয়া খেজুরের দাম হিসাব করে ৬৬০০ টাকা ফিতরা প্রদান করতে পারেন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে এই ৫টি পণ্যের মধ্যে আমরা কোন পণ্যের মূল্য ধরে ফিতরা আদায় করব? আমাদের দেশে প্রচলিত হচ্ছে সবচেয়ে কম দামের পণ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা। অর্থাৎ ফিতরা মানেই ৭০ টাকা। জ্বি, ৭০ টাকা দিয়ে আমরা সবাই ফিতরা দিলে তা আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু তা হবে ৩৩ পেয়ে পাস করার মত। কিন্তু যদি ফিতরার সওয়াবের ব্যাপারে এ প্লাস পেতে চাই তাহলে আমাদের সাধ্য মত বেশি মূল্যের পণ্য দিয়ে আদায় করতে হবে। কারো কারো জন্য হয় ৭০ টাকা দেয়াই এ প্লাস ক্যাটাগরির বলে বিবেচিত হবে। যদি তার উপার্জন বা সামর্থ্য কম থাকে।

ব্যাপারটাকে এভাবে চিন্তা করতে পারি। যদি কারো আর্থিক অবস্থা এমন হয় যে চালের দাম ৫০ টাকা কেজি হওয়াতে চাল কিনে খেতে পারছেন না। ২-১ বেলা আটা গুলে খেতে হয়। অর্থাৎ কোনো মতে বেঁচে আছেন। তাহলে তিনি আটার মূল্য হিসাবে ৭০ টাকা দিয়ে ফিতরা দিবেন। কারো যদি আরেকটু বেশি সামর্থ্য থাকে যে, ৩ বেলা ঠিকঠাক মত ভাত খেতে পারেন। বাচ্চাদেরকে কালে ভদ্রে হরলিক্স খাওয়াতে পারেন। সপ্তাহে ২-১ দিন হয়ত মাছ-গোশত খাওয়ার সামর্থ্য আছে। তিনি জন প্রতি যবের বাজারমূল্য হিসাবে ২৭০ টাকা ফিতরা দিবেন। আবার আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে মাঝেমধ্যে একটু ভাল খাবার খাওয়ার। বা ঈদের দিন বাসায় সেমাই-পায়েশ রান্নার সামর্থ্য আছে। সেমাই-পায়েশের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য কিসমিস, কাঠবাদাম, কাজু বাদাম ব্যবহার করেন। তিনি কিসমিসের মূল্য দিয়ে জন প্রতি ১৫০০ টাকা করে ফিতরা দিবেন। আবার যাকে আল্লাহ আরেকটু বেশি আর্থিক স্বচ্ছলতা দিয়েছেন। যিনি আজওয়া বা মরিয়ম খেজুর দিয়ে ইফতার করেন। মাঝে মধ্যে ৫০০ টাকা কেজির মিষ্টি কিনে পরিবারের সবাই মিলে খেতে বা আত্মীয়ের বাসায় নেয়ার সামর্থ্য আছে। তিনি খেজুরের মূল্য ১৬৫০ টাকা দিয়ে ফিতরা দিবেন। আবার সমাজের অনেকেই আছেন যাদেরকে আল্লাহ আরেকটু বেশি সম্পদ দিয়েছেন। মাঝে মধ্যে পোলাউ-গোশত খাওয়ার সামর্থ্য আছে। বাসায় ঘি-মাখন কেনা হয়। কালেভদ্রে ফাস্টফুড আইটেম যেমন বার্গার-পিৎজা খাওয়া হয়। পিৎজায় থাকা ডাবল প্যাটি আর চীজ বা পনির যাদের খুব প্রিয়। বাসায় হয়ত মাঝেমধ্যেই পনির কেনা হয়। তারা তাদের সম্পদের প্রাচুর্যতার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ফিতরা দিতে পারেন পনিরের মূল্য ২২০০ টাকা দিয়ে। অর্থাৎ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার, বিভিন্ন আর্থিক আয়-উন্নতির অবস্থার প্রেক্ষিতে আমরা নিজেরাই নির্ধারন করব যে আমরা কোন পণ্যের মূল্য দান করব। যেই রিকশাচালক মাসে ৫০০০ টাকা ইনকাম করেন, তিনি রমাদানের শেষে ৭০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতেই পারেন। অপর পক্ষে যেই ব্যক্তি মাসে ৫০,০০০ টাকা ইনকাম করেন তিনিও কি ৭০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করা শোভা পায়? যেই ব্যবসায়ী মাসে ৫ লাখ টাকা ইনকাম করেন তিনিও কি ৭০ টাকা দিয়েই ফিতরা দিবেন? তাই আসুন, আমরা এই বদ্ধমূল ধারণা থেকে সরে আসি যে ফিতরা মানেই সর্বনিম্ন ৭০ টাকা দিয়ে কোনো মতে দায় সারা! বরং আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে যত বেশি পরিমাণে পারা যায় তা দিয়ে ফিতরা আদায় করা। এই বিজনেসটা আল্লাহর সাথে। এখানে ইনভেস্ট করলে কোনো লসের আশংকা নাই। এই দানগুলোই ইনশাআল্লাহ আমাদের কবরে যাবে। যা আমরা জমা করে রেখে যাব, তা কিন্তু কবরে যাবে না!

এবার সাদাকাতুল ফিতরের বিস্তারিত বিধান, হুকুম ও মাসআলাগুলো দেখে নেয়া যাক।

সাদাকাতুল ফিতর কী?

সাদাকাহ অর্থাৎ দান; ফিতর অর্থ এক মাস রোজা রাখার পর রোজা ভাঙা। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে রোজা ভাঙা উপলক্ষে গরীব-মিসকিনকে যা দান করা হয়, তা-ই সাদাকাতুল ফিতর।

সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা কেন ওয়াজিব?

হাদীস শরীফ থেকে যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার পিছনে বেশ কিছু হিকমতের উল্লেখ পাওয়া যায়। সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবার পিছনে হিকমতগুলো নিম্নরূপঃ

ফিতরা ওয়াজিব হবার প্রথম কারণ

একজন রোজাদার ব্যক্তির রোজা পালন করতে গিয়ে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, যার কারণে রোজা তার ভঙ্গ হয়ে যায় না, কিন্তু রোজার ত্রুটি হয়। রোজার এ ত্রুটি মার্জনার জন্যই সাদাকাতুল ফিতর। যেমন একজন রোজাদার ব্যক্তি দিনের বেলায় পানাহার করেনি, স্ত্রী ব্যবহার করেনি, যার কারণে তার রোজা নষ্ট হয়নি। কিন্তু পরনিন্দা বা গিবত করেছে, অশ্লীল কথাবার্তা বলেছে, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলেছে, এতে রোজা ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে। এ থেকে রোজাকে পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ করার জন্যই সাদাকাতুল ফিতর।

ফিতরা ওয়াজিব হবার দ্বিতীয় কারণ

গরীব-দরিদ্র মানুষগুলো এই সমাজেরই মানুষ। তারা সারা বছরই দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে থাকে। তারা কমপক্ষে ঈদের দিনের একদিন যাতে ঈদ আনন্দে সকলের সাথে শরীক হতে পারে। এজন্য তাদের কিছু খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেয়া।

ফিতরা ওয়াজিব হবার তৃতীয় কারণ

দীর্ঘ এক মাস উপবাস থাকার পর আল্লাহ মেহেরবাণী করে ঈদের দিনে পানাহারের অনুমতি দিয়েছেন। তারই শুকরিয়া স্বরূপ সাদাকাতুল ফিতর।

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজাকে অপ্রয়োজনীয় ও অশ্লীল কথাবার্তা ও কার্যকলাপ থেকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য এবং মিসকীনদের কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন।

(আবু দাউদ, ইবনে মাজা, বায়হাকী)

অন্য হাদীসে রয়েছেঃ “তাদের আজকের দিনে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরা থেকে অমুখাপেক্ষী রাখ” (বায়হাকী, দারু কুতনী)

সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা কার উপর ওয়াজিব?

যাকাত, কুরবানী ও সদকায়ে ফিতিরের নিসাবের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলঃ যখন কোন ব্যক্তির কাছে একাধিক নিসাবের অংশ বিশেষ থাকে (অর্থাৎ কিছু স্বর্ণ, কিছু রূপা বা কিছু টাকা। অথবা শুধু স্বর্ণ, শুধু রূপা বা শুধু ক্যাশ টাকা)। কিন্তু কোনটি দিয়েই নিসাব পূর্ণ না হয়, এক্ষেত্রে যে কোন একটিকে নিসাব ধরে অন্য নিসাবী পণ্যের মূল্য হিসাবে আনা হয়। তখন যদি কোন একটি নিসাবের সমপরিমাণ মূল্যের নিসাব পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলেই তার উপর যাকাত, কুরবানী ও সদকায়ে ফিতির আবশ্যক হয়ে যায়।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। তাহল, গরীবদের জন্য উপকারী বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হয়। মূলনীতি অনুপাতে যেটি দিয়ে নেসাব পূর্ণ হবে, সেটিকেই গ্রহণ করতে হয়।

উদাহরণঃ কারো কাছে রূপা আছে আবার স্বর্ণও আছে। কিন্তু কোনটি দ্বারাই নিসাব পূর্ণ হচ্ছে না (অর্থাৎ স্বর্ণ সাড়ে সাত ভরি নাই, রূপাও সাড়ে ৫২ ভরি নাই)। এখন রূপার নিসাব সাড়ে বয়ান্ন তোলা রূপার সমমূল্য কত? তা নির্ধারণ করতে হবে। তারপর সেই মূল্যমান পরিমাণ যদি তার কাছে থাকা স্বর্ণের বাজার মূল্যের সমান বা বেশি হয়, তাহলে বলা হবে রূপা হিসেবে নেসাব পূর্ণ হয়ে গেছে। আর যদি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ এর মূল্য স্বর্ণ ও রূপা মিলে হয়ে যায়, তাহলে স্বর্ণের মূল্য হিসেবে নেসাব পূর্ণ হয়ে গেছে বলে ধর্তব্য হবে। যদি কোনটি দ্বারাই তার মূল্যের নেসাব পূর্ণ না হয়, তাহলেই কেবল বলা হবে যে, নেসাবের মালিক হয়নি।

তবে আমাদের কাছে এই পরিমাণ সম্পদ না থাকলেও যদের ফিতরার পরিমাণ টাকা সাদাকা করার তাওফিক আছে তাদের জন্যও উচিত হবে ফিতরা আদায় করা। বর্তমানে জনপ্রতি ফিতরার পরিমাণ ৭৫ টাকা থেকে শুরু করে ৩৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। ৭৫ বা ১০০ টাকা সাদাকা করার তাওফিক যদি অন্তত থাকে তাহলেই আমরা যেন এই দান করার সুযোগ নিই। কারণ এই দান আমরা আল্লাহর কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ আমাদেরকে সুযোগ দিয়েছেন দান করার, যেন এটি আমাদের উপকারে আসে। তাই আসুন আমরা সকলেই আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি টাকা দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করি।

পরিবারের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করবেন কে?

পরিবারের কর্তা তার নিজের ও তার অধীনস্থ নাবালেগদের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করবেন। স্ত্রীর ফিতরা আদায় করা স্বামীর জন্য আবশ্যক নয়। তবে যদি স্বামী আদায় করেন তাহলে স্ত্রীর পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে এবং স্বামীও এজন্য সাওয়াবের অংশীদার হবেন। স্ত্রী ব্যতীত কর্তার অধিনস্থ নাবালেগ ছেলে-মেয়ে বা কাজের লোক তাদের পক্ষ থেকেও তিনি ফিতরা আদায় করবেন। যাদের উপর রোজা ফরজ নয়, অথবা ফরজ হলেও যারা রমজানের রোজা রাখতে পারে নাই তাদের পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করতে হবে।

ফিতরা খাদ্য দিয়েই আদায় করতে হবে? নাকি টাকা দিয়েও আদায় করা যাবে?

বর্তমান সময়ে যেসকল বিধান নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই টপিক। ফিতরা কি খাদ্য দ্রব্য দিয়েই আদায় করতে হবে নাকি টাকা দিয়ে আদায় করলেও আদায় হবে এ নিয়ে ফকীহ বা ইমামদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ (রহ.) এর মতে নগদ অর্থ দেয়া বৈধ হবে না। কারণ হাদীসে স্পষ্ট ভাবে খাদ্যবস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সময়ের প্রচলিত মুদ্রা দিয়ে ফিতরা আদায় করার প্রমাণ হাদীস দ্বারা পাওয়া যায় না। তাই তাদের মত হচ্ছে খাদ্যবস্তু দ্বারাই ফিতরা দিতে হবে, টাকা দিয়ে ফিতরা আদায়ই হবে না।

অপরপক্ষে ইমাম আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরী, আতা, হাসান বাসরী, ওমর বিন আব্দুল আজিজ প্রমুখের মতে, নগদ অর্থ দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা বৈধ। কেননা সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের একটি অন্যতম লক্ষ্য হলো দরিদ্র মানুষকে ঈদের আনন্দে শরীক হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। দরিদ্র মানুষের যেমন প্রয়োজন খাদ্যের, তেমনি প্রয়োজন কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রীর।

সকলেই যদি শুধু খাদ্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে, তাহলে হয়তো তার ঘরে জমা হয়ে যাবে অঢেল খাদ্য। অথচ তার এত খাবারের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন তার কাপড়-চোপড়, সেমাই, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী। এ অবস্থায় তার প্রয়োজন পূরণের জন্য তাকে অতিরিক্ত খাবার বিক্রি করতে হবে। এতে যেমন রয়েছে বিক্রি করার বিড়ম্বনা, তেমনি বিক্রি করতে হবে তুলনামূলক কম মূল্যে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র মানুষটি।

এছাড়াও টাকা দিয়ে আদায় করার পক্ষে সাহাবী (রা) ও তাবেয়ীদের (রহ.) আমল রয়েছে। ইমাম বুখারীর উস্তাজ ইমাম আবু বকর ইবনে আবী শাইবা রহঃ তার পৃথিবী বিখ্যাত হাদীসের কিতাব “মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা” এর ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৫০৭ নং পৃষ্ঠায় শিরোনাম এনেছেন فِي إِعْطَاءِ الدَّرَاهِمِ فِي زَكَاةِ الْفِطْرِ তথা টাকার বিনিময়ে সদকায়ে ফিতির প্রদান করা। এর অধীনে তিনি একাধিক আছার উল্লেখ করেছেন।

তাই মধ্যমপন্থা অবলম্বনকারী আলেমদের অভিমত হচ্ছেঃ

খাদ্যবস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করলে তা হবে সুন্নাহ সম্মত। খাদ্যবস্তু বলতে তারা বুঝিয়ে থাকেন সমাজে যেসকল খাদ্যের প্রচলন আছে এমন খাদ্য দিয়ে দেয়া উত্তম। যেমন কেউ যদি ঈদের আগে ফিতরার পরিমাণ হিসাব করে ঐ টাকা দিয়ে সেমাই, দুধ, চাল, চিনি, গোশত ইত্যাদি একত্র করে কোনো গরীব পরিবারকে দেয়। যেন ঈদের দিন তারা একটু ভাল খাবার খেতে পারে। তাহলে তা সবচেয়ে উত্তম ও সুন্নাহ সম্মত হবে।

কিন্তু যদি কেউ খাদ্য না দিতে পারে, বরং টাকা দেয়। তাহলেও তা আদায় হয়ে যাবে। টাকা দিয়ে আদায় করাকে তারা জায়েজ বলেছেন। হয়ত পুরোপুরি সুন্নাহের অনুসরণ হলো না। কিন্তু ফিতরার মূল লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় এটাকে বাতিল বলে তারা রায় দেন না। তাই আমাদের উচিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করা খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা। অন্যথায় নিরুপায় হলে টাকা দিয়ে আদায় করা।

ফিতরা কখন অর্থাৎ কোন সময়ে আদায় করতে হবে?

হাদীসের রেওয়ায়েত মতে ঈদুল ফিতরের নামাজে যাওয়ার আগেই ফিতরা গরীবদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এক্ষেত্রে ফিতরা আদায়কারীর দায়িত্ব হচ্ছে গরীবদের কাছে ফিতরা পৌঁছে দেয়া। গরীব বা ফকিররা ফিতরার টাকা নেয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরবে না। ফিতরা আদায়কারীকে গরীবের বাড়ি যেতে হবে তার দায়িত্ব পালন করার জন্য। তাই খেয়াল রাখতে হবে ফিতরা যেন ঈদের নামাজের পর আদায় করতে না হয়। অনেকেই চিন্তা করতে পারেন ঈদগাহে অনেক ফকির আসে। নামাজ শেষ করে সবাইকে ৫-১০ টাকা করে দিব। কিন্তু এটা সুন্নতের খেলাফ।

ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করার বর্ণনা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। একই সাথে এমন কিছু রেওয়ায়েতও পাওয়া যায় যেখানে দেখা যায় সাহাবীরা (রা) ঈদের ২-১ দিন আগেও ফিতরা আদায় করেছেন। তাই আমরা চাইলে ঈদের ২-১ দিন আগে ফিতরা আদায় করে দিতে পারি। যেন যাকে দেয়া হচ্ছে সে ২-১ দিন আগে থেকেই ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারেন। যদি টাকা দেয়া হয় তাহলে ঈদের ২-১ দিন আগে দেয়া। বেশি আগে দিলে সে আবার অন্য কাজে খরচ করে ফেলতে পারে। ফলে ঐ ব্যক্তির পরিবারের লোকজন হয়ত ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই বেশি আগে টাকা না দেয়াই ভাল। খাদ্যদ্রব্য দিলেও তা ঈদের অনেক দিন আগে না দেয়াই ভাল। এমন একটা টাইমিং করে আমাদের এগুলো আদায় করা উচিত যাতে, যাকে দেয়া হচ্ছে সে সেগুলো ঈদের দিনে কাজে লাগাতে পারে।

ফিতরার পরিমাণ

সদাকায়ে ফিতর সম্পর্কিত হাদীসগুলো পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে মোট পাঁচ প্রকার খাদ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়: যব, খেজুর, পনির, কিসমিস ও গম। এ পাঁচ প্রকারের মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা সদকা ফিতর আদায় করতে চাইলে প্রত্যেকের জন্য এক সা’ পরিমান (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) দিতে হবে। আর গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে আধা ‘সা’ দিতে হবে।

প্রথম চারটি খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আদায় করতে চাইলে এক ‘সা’ পরিমাণ আর দ্বিতীয় প্রকার খাদ্য গম দ্বারা আদায় করলে প্রতিজনের জন্য অর্ধেক ‘সা’ পরিমাণ গম আদায় করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে যব, খেজুর, পনির ও কিসমিসের মত দামী খাবার দিয়ে আদায় করতে চাইলে এক ‘সা’ আর গমের মত কম দামী জিনিস দিয়ে আদায় করলে অর্ধেক ‘সা’ কেন আদায় করতে হয়? এর উত্তর হচ্ছে আরবে নবী (সা) এর সময়ে গমের উৎপাদন কম হত। গম পাওয়া যেত কম, তাই গমের দাম তখন অনেক বেশি ছিল। যেহেতু গমের দাম তখন অনেক বেশি ছিল সে কারণে গম দিয়ে আদায় করতে চাইলে তার জন্য অর্ধেক ‘সা’ পরিমাণ গম সাদকা করলেই আদায় হয়ে যেত। অপরপক্ষে যব, খেজুর, পনির আর কিসমিসের দাম সে সময় কম হওয়ায় আর সহজলভ্য হওয়ায় এগুলো দিয়ে আদায় করতে চাইলে ১ ‘সা’ পরিমাণ দিতে হত।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কোন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরার পরিমাণ হিসাব করি? আমরা সাধারণত ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করি গমের দাম দিয়ে। কারণ বর্তমান সময়ে গমের ফলন হয় অনেক বেশি। এর দাম কম। এটা যেহেতু অর্ধেক ‘সা’ (১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) দিলেই হয় তাই আমরা চালাকী করে গমের দাম দিয়েই ফিতরার হিসাব করি। আল্লাহর রাসূল (সা) গমের হিসাব করে দিয়েছিলেন এটার দাম বেশি ছিল দেখে। আমরা এখনকার মুসলিমরা এটার সুযোগ নিই এটার দাম কম হবার জন্য। সাহাবীগণ (রা) খেজুর দ্বারা ফিতরা দিতে পছন্দ করতেন। নবী (সা) বলেছেন সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভাল জিনিস দিয়ে ফিতরা আদায় করতে। আল্লাহ কুরআনেও দান করার সময় উত্তম বস্তুগুলো দিয়ে দান করতে উৎসাহ দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত উপরে উল্লেখিত ৫ রকমের খাবারের মধ্যে আমাদের সাধ্যে যেটা দিয়ে ফিতরা দেয়া সামর্থ্যে কুলায়  সেটা দিয়ে আদায় করা।

ইসলামি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের থেকে প্রতি বছর ফিতরার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এটা একটা ভাল উদ্যোগ। আলেম সমাজ এটাকে সাধবাদ জানিয়েছেন। উপরের ৫টা খাদ্যের মধ্যে সবচেয়ে দামী খাবারের দাম আর সবচেয়ে কমদামী খাবারের দামের হিসাব করে তারা এই ফিতরার রেঞ্জ নির্ধারণ করেন। যেমন গম দিয়ে আদায় করলে হয়ত ৭৫ টাকা আসবে। আর খেজুরের মধ্যে আজওয়া খেজুর দিয়ে আদায় করলে ৩৫০০ টাকার মত আসবে। সমাজে সবার অবস্থান এক না। যেই লোক মাসে ১০ হাজার টাকা ইনকাম করেন তিনি হয়ত ৭৫ টাকা দিয়ে আদায় করবেন। আবার যেই লোকের ইনকাম মাসে ১ লাখ টাকা সে চাইলে আল্লাহর ইচ্ছায় ৩৫০০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে পারেন।

আমরা এখানে ব্যবসা করছি আল্লাহর সাথে। এখন দুনিয়াতে আমরা যত বেশি ইনভেস্ট করে যেতে পারব, আখিরাতে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আমাদেরকে তত বেশি দিবেন। তাই নিজেদেরকে ফাঁকি না দিয়ে সাধ্যে যতটুকু কুলায় সে পরিমাণ ফিতরা আমরা আদায় করি। ধনী-গরীব সবাই গড়ে ৭৫ টাকা সর্বনিম্ন ফিতরা আদায় করার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভোগবাদী মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে দান করার মানসিকতা লালন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

তথ্যসূত্র

  1. সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ : কিছু কথা – মাসিক আলকাউসার
  2. রামাদানের সওগাত – ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর
  3. টাকা দিয়ে সদকায়ে ফিতির আদায় করলে আদায় হবে না? – আহলে হক্ব মিডিয়া
  4. স্বর্ণ ও রূপা কোনটি হিসেবেই যদি নেসাব পূর্ণ না হয় তাহলে কি কুরবানী আবশ্যক হয় না? – আহলে হক্ব মিডিয়া
  5. সাহেবে নিসাব বলতে কী বুঝায়? স্ত্রীর কুরবানীর টাকা সংগ্রহ করা কার দায়িত্ব? – আহলে হক্ব মিডিয়া
  6. সাদাকাতুল ফিতরের পরিচয় গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা ও আদায়ের বিধানাবলী – দৈনিক সংগ্রাম

6 thoughts on “সাদাকাতুল ফিতরের বিধান, পরিমাণ ও কিছু মাসআলা

  1. ভাই আসসালামু আলাইকুম। আপনার নিবন্ধটি তে আপনি যে তথ্যগুলো সংযুক্ত করেছেন সেগুলোর উৎস উল্লেখ করলে ভালো হতো তাহলে আমাদের মধ্যে কোন সন্দেহ থাকত না ধন্যবাদ।

    1. তথ্যসূত্রগুলো জানার জন্য কষ্ট করে লেখার শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে ভাই। ৬ টা রেফারেন্স যুক্ত আছে শেষে।

  2. কেউ কি মাঝামাঝি হিসাব করে দেয় তাহলে কি কোন সম্যসা হবে? যেমন ১০০০ টাকা করে দিলে।

    1. এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। কোনো আলেম এর থেকে কনফার্ম হয়ে নিলে ভাল হবে।
      তবে আমি যেটা বুঝি, বাজারে একই পণ্যের কম দাম বা বেশি দাম আছে। খেজুরের দাম ১৩০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০০ টাকা কেজি আছে। আপনি ১০০০ টাকা দিতে চাইলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম খেজুরের মূল্য আসবে কেজি প্রতি ৩০০ টাকার মত। মানে বাজারে যদি খোজ নিয়ে দেখেন ৩০০ টাকা কেজির খেজুর পাওয়া যায় তাহলে আপনি ঐ খেজুরের মূল্য বাবদ ১০০০ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করলে ইনশাআল্লাহ আদায় হয়ে যাবে। কারণ আপনার সাধ্য মত আপনি যতটা উন্নত মানের খেজুরের দাম দিতে চাচ্ছেন সেটা চেষ্টা করেছেন। এটা আমার সাধারণ জ্ঞানের থেকে বললাম। একাডেমিক নলেজ থাকা কোনো ইসলামিক স্কলারের থেকে বিষয়টা ভেরিফাই করে নিবেন।

  3. আমি যদি টাকা বা খাদ্য না দিয়ে নতুন জামা কিনে দেই তাহলে কি ফেতরা আদায় হবে?

    1. টাকা দিয়ে আদায় করলে আদায় হয়ে যাবে বলে আলেমগণ ফতোয়া দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে জামা কিনে দিলেও ইনশাআল্লাহ আদায় হয়ে যাবে। কারণ এটাও তার মৌলিক প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *