পোস্টটি পড়া হয়েছে 311 বার
রামাদানের সওগাত - ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

রামাদানের সওগাত – [বই রিভিউ – ৭]

বাংলা ভাষাভাষী এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে যিনি ইসলাম নিয়ে খানিকটা পড়াশোনা বা জানাশোনার মধ্যে আছেন অথচ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ) স্যারের নাম জানেন না। সকল শাখাগত মতপার্থক্যের উর্ধ্বে উঠে কিভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামের সুমহান দাওয়াত প্রচার করতে হয় তার এক অনুপম দৃষ্টান্ত তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

“রামাদানের সওগাত” এই বইটি মূলত স্যারের রচিত “খুতবাতুল ইসলাম” বই থেকে রমাদানের অধ্যায়গুলোকে আলাদা করে সন্নিবেশ করা। “খুতবাতুল ইসলাম” বইটিতে তিনি সমসাময়িক বিষয়কে মলাটবদ্ধ করেছেন যেন জুমআর সালাতে খতিব সাহেবগণ এখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে উপস্থান করতে পারেন। কিন্তু ঐ বইটি বেশ বড় আর দামের দিক থেকেও একটু বেশি হওয়ায় রমাদানের অংশগুলোকে নিয়ে ছোট্ট এই বইটি প্রকাশ করা হয়েছে।

বইটিতে রয়েছে ৫ টি অধ্যায়। অধ্যায়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

১ম অধ্যায়ঃ সিয়াম, রামাদান ও কুরআন

এ অধ্যায়ে লেখক রামাদান মাসকে কুরআনের দলিলের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করেছেন কুরআনের সাথে। অর্থাৎ এটি কুরআন নাযিলের মাস এবং কুরআন পড়ার ও অনুধাবনের মাস। আল্লাহ বলেছেন যে, এটি রমাদান মাস; যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন। আমরা রমাদানকে গ্রহন করেছি কিন্তু কুরআনকে ছেড়ে দিয়েছি। তাই রমাদানে আমাদের যেই তাক্বওয়া অর্জিত হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। আমরা তারাবীহ সালাতে ইমাম সাহেবের তিলাওয়াত শুনছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না তিনি কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশগুলো আমাদেরকে শোনাচ্ছেন। সেখানে বলা হচ্ছে সুদ না খেতে, ঘুষ না খেতে, দুর্নীতি না করতে, ওজনে কম না দিতে, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ না করতে। কিন্তু আমরা সেগুলোর কোনোটাই বুঝতে পারছি না। তাই সালাত থেকে বের হয়ে নিজ নিজ মর্জি মাফিক আমরা এই হারাম কাজগুলো করে যাচ্ছি।

একজন এমপি, মন্ত্রী যদি আমাদেরকে কোনো চিঠি লিখেন। তাহলে আমরা উদগ্রীব হয়ে বারবার পড়ি, বুঝি ও অনুধাবন করি চিঠির বক্তব্যগুলো। কিন্তু সারা জাহানের বাদশাহ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের কাছে মেসেজ পাঠালেন। আমরা তার এক বর্ণ বুঝলাম না। বুঝতে না পারার জন্য আমাদের কোনো দুঃখবোধও নাই। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা অর্থ বোঝা তো দূরে থাকুক, দেখে দেখেও কুরআন পড়তে পারেন না। আল্লাহু আকবার! আমরা আল্লাহর দরবারে কোন মুখ নিয়ে হাজির হব? আমরা বছরের পর বছর কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করি। এগুলোর জন্য বাচ্চাদের অভিভাবকেরা কত পেরেশানিতে থাকেন। কিন্তু কুরআন শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে আমাদের যেই অনীহা! আমরা আল্লাহর কাছে কী কৈফিয়ত দিব?

লেখক এখানে সকলের প্রতি সবিনয় আহ্বান জানিয়েছেন কুরআন তিলাওয়াত সহীহ করার জন্য, শুদ্ধ তিলাওয়াতের জন্য এবং পুরো কুরআন অর্থ বুঝে পড়ার জন্য।

২য় অধ্যায়ঃ আহকামে সিয়াম ও কিয়াম

এই অধ্যায়ের শুরুতে লেখক বেশ কিছু হাদীসের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন সাহরি খাওয়ার ফজিলতের কথা। ইফতারের সুন্নাহ পদ্ধতির কথা। লেখক বলেছেন এই মাস আসলে আমরা খাওয়ার মাস বানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু সাহাবী ও তাবেয়ীদের জন্য এটা ছিল অন্যকে খাওয়ানোর মাস। যাদের সামর্থ্য কম থাকায় অন্যকে ইফতার করাতে পারতেন না তারা একে অন্যের ইফতার বদল করতেন। যেন উভয়েই অন্যকে ইফতার করানোর সওয়াব পেতে পারেন।

লেখক বর্তমান সময়ের একটা গর্হিত কাজের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছেন। তা হচ্ছে সাহরির সময় মসজিদ থেকে মাইকে এক দেড় ঘন্টা যাবত ডাকাডাকি করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, ইসলামি গজল গাওয়া ইত্যাদি। কারণ ঐ সময় অনেকেই হয়ত আগে সাহরি করে ঘুমিয়ে পড়েছেন, কেউ হয়ত ঐ সময় তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করছেন বা ব্যক্তিগত ইবাদত করছেন। তাই এরকম এক টানা ডাকাডাকি করতে তিনি নিষেধ করেছেন। বর্তমান সময়ে সকলের কাছেই মোবাইল ফোনে অ্যালার্মের সিস্টেম আছে। তারপরেও মাইকে অল্প কিছু সময় ডাকা যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই কাজ করলে অনেকেরই কষ্ট হতে পারে। তাই কোনো মানুষের কষ্ট হয় এমন কাজ করা যাবে না।

এ অধ্যায়ে বলা হয়েছে সিয়ামরত অবস্থায় গিবত করা, মিথ্যা বলা ইত্যাদি হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য। হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে উৎসাহ দেয়া হয়েছে প্রচুর সাদাকাহ করতে। সাদাকার কারণে গুনা ক্ষমা করা হয় ও বালা-মুসিবত দূর হয়। অর্থ সম্পদ সাদাকার পাশাপাশি আরো অনেক উপায়ে সাদাকাহ করা যায়। দুই জন ব্যক্তির মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে দেয়া সাদাকাহ, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সাদাকাহ, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া সাদাকাহ, কোনো ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলাও সাদাকাহ। এমন কি প্রতি মাসের বেতন পেয়ে আপনি আপনার পরিবারের জন্য যে বাজার করছেন, বাসা ভাড়া দিচ্ছেন সকল খরচই সাদাকাহ বলে গণ্য হবে। সুবহানাল্লাহ!

অধ্যায়ের শেষে আলোচনা করা হয়েছে কিয়ামুল্লাইল বা রাতের সালাত নিয়ে। যাকে আমরা তারাবীহ সালাত বলে থাকি। এ বিষয়ে হাদীসের উদ্ধৃতি থেকে আমরা জানতে পারি “যে ব্যক্তি খাটি ঈমান ও ইখলাসের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে রামাদনে কিয়ামুল্লাইল আদায় করবে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে”। তাহলে আমরা এই সালাতটি আদায়ে এত অনীহা কেন দেখাই। অনীহা দেখানোর প্রমাণ হচ্ছে আমাদের দেশে রকটের গতিতে তারাবীহ সালাত আদায় করা। আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের সাথে এই সীমাহীন বেয়াদবী ক্ষমা করুন।

রমাদান আসলেই তারাবীহ সালাত ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত তা নিয়ে দুই গ্রুপ হয়ে বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের এসব থেকে হেফাজত করুন। রসূল (সা) রমাদান ও রামাদান ছাড়া অন্য সময়েও প্রতি রাতে মধ্যরাত থেকে শেষ রাত পর্যন্ত প্রায় ৪-৫ ঘন্টা কিয়ামুল্লাইল আদায় করতেন। সাহাবীগণ রমাদানে রাসূলের (সা) সাথে জামায়াতে কিয়ামুল্লাইল আদায় করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এই সালাত ফরজ হয়ে যাওয়ার আশংকায় রাসূল (সা) তাদেরকে নিজ নিজ ঘরে আদায় করার উপদেশ দেন। সে সময় বেশির ভাগ সাহাবীই আংশিক বা পুরো কুরআনের হাফিজ ছিলেন। তাই তারা নিজ ঘরে দীর্ঘ তিলাওয়াতের মাধ্যমে এ সালাত আদায় করতেন।

রাসূল (সা) এর ইন্তেকালের পর, দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমার (রা) এর সময়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরা কুরআনে হাফিয না হওয়ায় হাফিযদের পিছনে কিয়াম করতে চেষ্টা করতেন। তাই মসজিদে নববীতে সালাতুল ইশার পর ছোট ছোট তারাবীহ সালাতের জামাত শুরু হত। তা দেখে উমার (রা) উবাই ইবনু কাবকে (রা) বলেন, মানুষেরা দিনে রোজা রাখে। কিন্তু কুরআনের হাফিজ না হওয়ায় ঠিক মত কিয়ামুল্লাইল আদায় করতে পারছে না। এজন্য আপনি তাদেরকে নিয়ে সালাতুল ইশার পর জামাতে কিয়াম বা তারাবীহ আদায় করুন। এছাড়াও তিনি সুলাইমান ইবনু আবী হাসমাকে নির্দেশ দেন মহিলাদের নিয়ে পৃথক তারাবীহের জামাত করতে। তৃতীয় ও চতুর্থ খলিফা হযরত উসমান (রা) ও আলী (রা) এর সময়েও মহিলাদের জন্য পৃথক তারাবীহ জামাত কায়েম করা হত।

হযরত উমারের (রা) সময়ে ৮ ও ২০ রাকাত তারাবীহ পড়া হত বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় যে, সাহাবী-তাবেয়ীদের সময়ে ইশার পর থেকে মধ্য রাত বা শেষ রাত পর্যন্ত তারাবীহ পড়া হত। প্রথম দিকে ৮ রাকাত তারাবীহের প্রতি রাকাতে ১/২ পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এভাবে অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর হওয়ায় পরবর্তীতে ২০ রাকাতের মাধ্যমে পুরো সময়টা তারাবীহ আদায় করতেন। অর্থাৎ একই পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত হত কিন্তু এক টানা না দাঁড়িয়ে মাঝে রুকু সিজদা ও বিরতি দেয়া হত।

কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা যেই গতিতে তারাবীহ আদায় করি তাতে সাহাবীদের সেই সুন্নাহ আদায় হয় না। যারা ২০ রাকাত পড়ি তারাও রকেটের গতিতে তিলাওয়াত করি ও শুনি। হাফেজ সাহেবের অনেক শব্দই তার মুখের ভিতরে থেকে যায়। সঠিক ভাবে উচ্চারিত হয় না। ফলে পূর্ণাঙ্গ কুরআন খতমের সওয়াব লাভ হয় না। আবার যারা ৮ রাকাত পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসি বা একই গতিতে ৮ রাকাত পড়ি তারাও চরম অন্যায় কাজ করি। হাদীস থেকে জানা যায়, যদি কেউ ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত কিয়ামুল্লাইল আদায় করে তবে সে সারারাত কিয়ামুল্লাইলের সওয়াব পাবে। আল্লাহ আমাদেরকে দীর্ঘ তিলাওয়াত, ধীরস্থির ভাবে ও দীর্ঘ রুকু সিজদা বিশিষ্ট তারাবীহ সালাত আদায় করার তাওফিক দান করুন।

৩য় অধ্যায়ঃ যাকাত

বেশির ভাগ মানুষই হিসাবের সুবিধার্থে বা সওয়াব বেশি হওয়ার উদ্দেশ্যে রমাদান মাসে যাকাত আদায় করেন। লেখক এই অধ্যায়ে যাকাতের নিসাব, এর খাত ও পরিমাণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অনেক বড় একটা অংশ জুড়ে আলোচনা করেছেন ফসল ও ফল-ফলাদির যাকাতের ব্যাপারে। আমাদের সমাজে বা দেশে সম্পদের যাকাত দিলেও কেউই আসলে ফসল বা ফল-ফলাদি উৎপন্ন করার পর এর যাকাত আদায় করেন না। লেখক এই অধ্যায়ে এর বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। ফসলের যাকাতের উপর লেখকের আলাদা একটি বই রয়েছে। বইয়ের নাম বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাতঃ গুরুত্ব ও প্রয়োগ।

৪র্থ অধ্যায়ঃ শবে কদর, ইতিকাফ ও ফিতরা

লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে কুরআনে স্বতন্ত্র একটি সূরা রয়েছে। এর ফজিলত ও সওয়াবের ব্যাপারে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ দেশে শবে বরাত নিয়ে মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায় এক শত ভাগের এক ভাগও শবে ক্বদরকে নিয়ে দেখা যায় না। ভাগ্য লিপিবদ্ধ হওয়ার রাত শবে ক্বদর। এদেশের মানুষ শবে ক্বদরের এই ফজিলতে নিয়ে গেছে শবে বরাতের রাতে। লেখক হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে উৎসাহ দিয়েছেন রমাদানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে বিশেষ ভাবে ইবাদত করতে। কিয়ামুল্লাইল আদায় করে সাহরির আগে উঠে আবারো দীর্ঘ সময় তাহাজ্জুদ পড়তে। তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরা এই রাতের সওয়াব হাসিল করতে পারব। আমাদের দেশে শবে ক্বদর বলতেই ২৭ রমাদানকে বুঝানো হয়। আল্লাহর রাসূল (সা) এই রাতকে কনফার্ম করেন নাই। তিনি বলেছেন শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে এর অনুসন্ধান করতে। অর্থাৎ বিজোড় রাতগুলোতে শবে বরাত হচ্ছে মনে করে আমল করতে। তা না করে আমরা ২৭ রমাদানকে ফিক্সড করে নিয়েছি। এতে কি আমাদের লাভ নাকি লস?

শেষ দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে ই’তিক্বাফ করা। অর্থাৎ জাগতিক কাজকর্ম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে মসজিদে পুরো সময়টা ইবাদতের মধ্যে কাটানো। আমাদের সকলের চেষ্টা করা উচিত যেন এই দশ দিনের সুন্নাহ ইতিকাফ পালন করতে পারি। সম্ভব না হলে নফল বা মুস্তাহাব হিসাবে ২-১ দিনের জন্য হলেও এটা আদায় করা যায় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

এ অধ্যায়ের শেষ অংশ হচ্ছে যাকাতুল ফিতর। বা আমরা যেটাকে ফিতরা হিসাবে অভিহিত করি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রতি বছর ফিতরার পরিমাণের একটা রেঞ্জ বলে দেয়া হয়। সেখানে সর্বনিম্ন থাকে ৭৫-৮০ টাকা। আর সর্বোচ্চ থাকে ৩০০০ টাকা বা আরো বেশি। আমাদের উচিত শুধু আদায় করার জন্য সর্বনিম্নটা দিয়ে আদায় না করে। বরং আমাদের সাধ্য অনুযায়ী যত বেশি পরিমাণ টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে পারি। এই পার্থক্যটা হয়ে থাকে হাদীসে বিভিন্ন খাদ্য দ্বারা ফিতরা দেয়ার বিধান থাকার কারণে। আটা দিয়ে, খেজুর দিয়ে, পনির দিয়ে ফিতরা দেয়া যায়। আমরা আটার মূল্য ধরে ফিতরা হিসাব করলে এর মূল্য আসে ৭৫-৮০ টাকা। কিন্তু খেজুর দিয়ে হিসাব করলে এর মূল্যমান আসবে ৩০০০ টাকার উপরে। তাই আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এমন পণ্যের হিসাবে ফিতরার টাকা দেয়া উচিত যেটা দিলে গরীবের উপকার হয়। যত বেশি দিতে পারব সেটা তো আমাদেরই লাভ! এই দান করা সম্পদগুলিই তো কেবল মৃত্যুর পরের একাউন্টে জমা হতে থাকবে! সাদাকাতুল ফিতরের উপর ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারের ৬ মিনিটের একটি বক্তব্য দেখতে পারেন এখান থেকে।

৫ম অধ্যায়ঃ জুমু’আতুল বিদা ও ঈদুল ফিতর

জুমু’আতুল বিদার আলোচনায় লেখক আমাদের উদ্দশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। জুমু’আতুল বিদার মাধ্যমে আমরা রমাদানকে বিদায় জানাব কিভাবে? বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে নাকি বিশ্বস্ততার মাধ্যমে? রমাদান এসেছিল কুরআন নিয়ে, রোজা নিয়ে, সাদাকা নিয়ে, কিয়ামুল্লাইল নিয়ে, গিবত-পরচর্চা থেকে বিরত রাখা নিয়ে, মানুষকে খাওয়ানো নিয়ে। আমরা রমাদানকে বিদায় জানানোর সাথে সাথে কি এগুলোকেও বিদায় করে দিব পরের এক বছরের জন্য? লেখক এটাকে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন রমাদানের শিক্ষা অনুযায়ী বছরের বাকি মাসগুলোতে অন্তত ৩ টা করে রোজা রাখতে। অসংখ্য সহীহ হাদীস দ্বারা সকল হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে। সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার উৎসাহ দেয়া হয়েছে। শাওয়াল মাসের ২ তারিখ থেকে এর শেষ পর্যন্ত যে কোনো ৬ দিন রোজা রাখতে বিশেষ ভাবে হাদীসে এসেছে। আমাদের উচিত রমাদানের শিক্ষাকে এক বছরের জন্য আমাদের জীবন থেকে বিদায় করে না দেই। এই রোজাগুলো নিয়মিত রাখি। নিয়মিত কিয়ামুল্লাইল আদায় করি। রাতের শেষ ভাগে উঠতে না পারলে রাত ১০-১১টার দিকে ঘুমানোর আগে অন্তত ২-৪ রাকাত কিয়ামুল্লাইল আদায় করি। রমাদানে যেভাবে আমরা গিবত থেকে, ঝগড়া করা থেকে বিরত থেকেছি বাকি সময়টাও যেন সেরকম থাকতে পারি। অনেক ভাইয়েরাই রমাদান উপলক্ষ্যে দাড়ি কাটা বন্ধ রাখেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে ঈদের সালাতে যাওয়ার আগেই দাড়ি কাটার মত একটা হারাম কাজের মাধ্যমে ঈদের প্রস্তুতি নেন। আল্লাহ আমাদেরকে এসব থেকে মুক্ত রাখুন।

ঈদুল ফিতরের বিষয়ে লেখক বলেছেন এর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক গুরুত্বের কথা। একটা হাদীস উল্লেখ করে লেখক বলেছেন “চাঁদ দেখে রোজা রাখ, চাঁদ দেখে ঈদ করো” এর মানে এই নয় যে, যে কেউ চাঁদ দেখলেই রোজা বা ঈদ করতে পারবে। বরং এর জন্য রাষ্ট্রের ঘোষণার প্রয়োজন আছে। রাষ্ট্রীয় ঘোষণার বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ ব্যক্তিগত ভাবে নিজের চোখে চাঁদ দেখলেও রোজা বা ঈদ পালন করতে পারবে না। এই মর্মে তিনি হাদীসের দলিলও পেশ করেছেন। নব্য যেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছেন একদল মানুষ। যারা ঐক্যের নামে সারা বিশ্বে বা মধ্য প্রাচ্যে যেদিন চাঁদ দেখা যায় সেদিন রোজা বা ঈদ পালনের কথা বলছেন। তারা মূলত দেশের ঐক্য নষ্ট করছেন। রাষ্ট্রের ঘোষণার বাইরে গিয়ে দেশের মুসলিম কম্যুনিটির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছেন। আল্লাহ এই সকল লোকদের সঠিক বুঝ দান করুন।

বই সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য

নামঃ রামাদানের সওগাত

লেখকঃ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহিমাহুল্লাহ)

পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৬৪

প্রকাশনীঃ আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স

মুদ্রিত মূল্যঃ ৫০ টাকা মাত্র

অনলাইন থেকে কিনতে চাইলে নিয়ামাহ শপ থেকে কিনতে পারেন

আল্লাহ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারকে জান্নাতের উচ্চ স্থান দান করুন। এই বইয়ের প্রকাশের সাথে যারা জড়িত সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমরা যারা বইটি পড়েছি বা রিভিউ পড়লাম, তাদেরকে আল্লাহ এর উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

1 thought on “রামাদানের সওগাত – [বই রিভিউ – ৭]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *