পোস্টটি পড়া হয়েছে 25,422 বার
ramadan sahri iftar time wrong concept

সাহরি ও ইফতারের সময়ঃ প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

Post updated on 28th May, 2020 at 08:14 pm

পরিপূর্ণ জীবন বিধান ইসলামের সৌন্দর্যগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে এর দালিলিক অবস্থান। অর্থাৎ ইসলামের সকল আমল, সকল বিধানই দলিল নির্ভর। ইসলামী শরীয়তের জ্ঞানের মূল উৎস হচ্ছে কুরআন। এরপর হাদীস। এরপর সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীনদের আমল। এগুলোর মধ্যেও কোনো বিষয়ের সরাসরি সমাধান খুঁজে না পাওয়া গেলে ইসলাম বিষয়ে অভিজ্ঞ আলেমগণ কুরআন-হাদীস বা সাহাবী, তাবেয়ীনদের আমলের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ইজমা বা কিয়াস করেন।

সাহরি ইফতার কখন হবে সেটা ইসলামী শরীয়তে খুব স্পষ্ট করে বলা আছে। কিন্তু আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই ইসলামের বিষয়ে নূন্যতম জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন না। ফলে সাহরি-ইফতারের সময়ের মত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়েও যে যার মত করে ধারণা পোষণ করে থাকেন। আমরা রোগ হলে ডাক্তারের মত অনুযায়ী চলি। আইনের সাহায্যের জন্য উকিলের মত মেনে কাজ করি। শুধু ইসলামের কোনো বিষয় সামনে আসলে আমরা অতি বিজ্ঞের মত বলি “আমার মতে এইটা হওয়া উচিত!”

আসতাগফিরুল্লাহ! আল্লাহর রাসূলের (সা) সাহাবীগণের কাছে কোনো বিষয়ে কেউ ফতোয়া জানতে চাইলে তারা সবাই অন্য কারো কাছে রেফার করতেন। যেন তার মানবিক ভুলের কারণে তার দ্বারা একটা ভুল প্রচার না হয়। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের মত করে চলার তাওফিক দান করুন।

আমাদের অনেকের ভুল ধারণা আছে যে “আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত সেহেরী খাওয়া যায়। আর, ইফতারের জন্য নিজের এলাকার মসজিদের আজান শুনলেই শুধু ইফতার করা যাবে”। আসলে ব্যাপারগুলো এমন না। আমরা কিছু ভুল ধারণার উপর বসে আছি। এই দুটি বিষয়ের উপর এখানে আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ। আলোচনাগুলো অবশ্যই “আমার মত” নয়। হাদীস ও আলেমদের মতগুলোকেই আমি এখানে উল্লেখ করার চেষ্টা করব। আশা করি “কত নতুন নতুন ফতোয়া শুনতেছি! হুজুরদের যা করলে সুবিধা হয় সে অনুযায়ী নতুন হাদীস বের করে” এই ধরণের গর্হিত কমেন্ট এই লেখার নিচে আসবে না।

ফজরের আযানের সময় সাহরি খেতে থাকলে রোজা শুদ্ধ হবে না

সেহরীর শেষ সময় হচ্ছে সুবহে সাদিক। অর্থাৎ পুব আকাশে হালকা সাদা আলোর আভা দেখা যাবার সাথে সাথেই সেহরীর সময় শেষ হয়। আর এই সুবহে সাদিকের পর থেকে সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত ফজরের নামাজের সময় থাকে।

যেমনঃ আজকের সেহরীর শেষ সময় যদি ভোর 3:42 হয়। তার মানে হলো সুবহে সাদিক শুরু হচ্ছে ৩টা ৪২ মিনিট থেকে। অর্থাৎ ৩টা ৪২ থেকে ফজরের সময় আরম্ভ হচ্ছে। রোজার সময় সুবহে সাদিক শুরু হবার ৫-৬ মিনিটের মধ্যেই ফজরের আজান হয়ে নামাজের জামাত দাঁড়ায়। কিন্তু অন্যান্য সময় ফজরের আজান ও জামাত হয় আরো পরে। ফজরের জামাত শেষ হয় সূর্য ওঠার ১০-১২ মিনিট আগে।

তাই বুঝাই যাচ্ছে যে ফজরের আজান (ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার) আগে বা পরে হতে পারে। আজান শুরু হবার আগেই সেহেরীর শেষ সময় পার হয়ে যায়। ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথে সাহরির সময় শেষ হয়ে যায়। অতএব এটা মনে করার কোন কারণই নাই যে আজান হবার পূর্ব পর্যন্ত বা আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত খাওয়া যাবে।

আজানটা সেহরীর শেষ সময় নির্দেশ করে না বরং সুবহে সাদিকই সেহরীর শেষ সময় নির্দেশক।

আযান দেয়ার সময় পানাহার করলে ঐ দিনের রোজাটা নষ্ট হয়ে যাবে। পরে আবার তার কাজা আদায় করতে হবে

তাই আমাদের সকলেরই উচিত নিজ নিজ এলাকার সুবহে সাদিক বা সেহরীর শেষ সময় অনুযায়ী সেহরী খাওয়া শেষ করা। মসজিদের সাইরেন বা রেডিও-টিভির ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করার থেকে নিজেই সতর্ক হওয়া উত্তম। ভাল হয় সতর্কতার জন্য শেষ সময়ের ২-৩ মিনিট আগেই খাওয়া-দাওয়া শেষ করা।

উল্লেখ্য যে, আবু দাঊদ শরীফের এক হাদীসের বর্ণনায় পাওয়া যায় নবী (সাঃ) বলেছেন “আযান চলাকালীন সময়ে কেউ খেতে থাকলে সে যেন আযানের কারণে খাওয়া বন্ধ না করে। বরং তার প্রয়োজন পুরো হওয়া পর্যন্ত খাদ্যগ্রহন করে।” অনেকেই এই হাদীসের উপর আমল হিসেবে আযানের সময়েও খাদ্যগ্রহনের পক্ষে মত দেন।

তবে এই আজান বলতে ঠিক আমাদের দেশের মত আযানের কথা বুঝানো হয় নি। দুটি আযান দেয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত ছিল।

১ম আযান সেহরী খাওয়ার জন্য এবং ২য় আযান সেহরী খাওয়া শেষ করার জন্য। এজন্য দুজন মুআজ্জিনও আলাদা করা ছিল।

‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

বিলাল (রাঃ) রাত থাকতে আযান দিয়ে থাকেন। কাজেই তোমরা (সাহ্‌রী) পানাহার করতে থাক; যতক্ষণ না ইব্‌নু উম্মে মাকতূম (রাঃ) আযান দেন।

(বুখারী ৬২০)

বিলাল (রা) আজান দিতেন তাহাজ্জুদ আদায়কারীরা যেন ফিরে এসে সাহরি করে নেয় এবং ঘুমন্ত লোক উঠে যেন সাহরি করতে পারে সেজন্য।

আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন :

বিলাল রাতে তোমাদের ঘুমন্ত লোকদের জাগানোর জন্য এবং সালাতরত লোকদের ফিরিয়ে আনার জন্য আযান দেন। তিনি ইশারায় বোঝালেন যে, সুবহে কাযিবের প্রকাশে ফজর হয় না।

(নাসায়ী ৬৪১)

আহমদ ইবন ইউনুস (র) আবদুলাহ্ ইব্ন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: বিলালের আযান যেন তোমাদের কাউকে সাহরী খাওয়া থেকে বিরত না রাখে । কেননা, সে রাত থাকতে আযান দেয়- যেন তোমাদের মধ্যে যারা তাহাজ্জুদের সালাতে রত তারা ফিরে যায় আর যারা ঘুমন্ত তাদের জাগিয়ে দেয় । তারপর তিনি আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললেন: ফজর বা সুবহে সাদিক বলা যায় না, যখন এরূপ হয়- তিনি একবার আঙ্গুল উপরের দিকে উঠিয়ে নীচের দিকে নামিয়ে ইশারা করলেন, যতণ না এরূপ হয়ে যায় ।

বর্ণনাকারী যুহাইর (র) তাঁর শাহাদাত আঙ্গুলদ্বয় একটি অপরটির উপর রাখার পর তাঁর ডানে ও বামে প্রসারিত করে দেখালেন । [ অর্থাৎ আলোর রেখা নীচ থেকে উপরের দিকে লম্বালম্বিভাবে যখন প্রসারিত হয়, তখন প্রকৃতপে ফজরের ওয়াক্ত হয় না । ইহাকে ‘সুবহে কাযিব’ বলা হয় । কাজেই এ রেখা দেখে ‘সুবহে সাদিক’ হয়ে গেছে বলে যেন কেউ মনে না করে । তবে যখন পূর্বাকাশে আলোর রেখা উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত হয়, তখনই প্রকৃতপক্ষে সুবহে সাদিক ।]

আযান শুরু আগ পর্যন্ত কি সাহরি খাওয়া যাবে?

অতএব বুঝা গেল রাসূলের (সা) সময়ে যেই আজান পর্যন্ত খাওয়ার অনুমতি ছিল সেটা আমাদের বর্তমানের আজান নয়। কারণ এখন দুইটা আজান দেয়া হয় না। একটা আজানই দেয়া হয় আর তা হচ্ছে সুবহে সাদিক প্রকাশিত হওয়ার পর। অর্থাৎ উম্মে মাকতুম (রা) খাওয়া থেকে বিরত করার জন্য যেই আজান দিতেন। আর বর্তমানের ক্যালেন্ডারগুলোতে স্পষ্ট করে লেখা থাকে সাহরির সময় কখন শেষ হবে, কখন সুবহে সাদিক বা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হবে। আমরা ফজরের ওয়াক্ত শুরুর সময়ের আগ পর্যন্ত খেতে পারি। সাধারণত ক্যালেন্ডারে ফজরের সময় শুরু হওয়ার ৪-৫ মিনিট আগের সময়কে সাহরির শেষ সময় বলে উল্লেখ করে থাকে। এটা বাড়তি সতর্কতার জন্য। কিন্তু আপনি চাইলে ফজরের ওয়াক্ত শুরুর যে সময় দেয়া থাকে তার আগ পর্যন্তও খেতে পারবেন।

আমাদের দেশের আযান শুরু হয় সুবহে সাদিকের পর। আর সেহরীর শেষ সময় হচ্ছে সুবহে সাদিক শুরুর আগ পর্যন্ত। তাই আযান পর্যন্ত সেহরী খেতে থাকলে তার রোযা হবে না। কারণ সুবহে সাদিক শুরু হবার ৪-৫ মিনিট পর আযান দেয়া হয়। এই ৪-৫ মিনিট সময়ের মধ্যেও সাহরি খাওয়া যাবে না। অনেককে আযান পর্যন্ত সময় পান খেতে দেখা যায়। পান মুখে দিয়ে আযান পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকলে রোযা হবে না। -শামী:২/৪০৫, উসমানী:২/১৮৬

এরপরেও অনেকে তর্কের খাতিরে বলবেন আযান শেষ হওয়া পর্যন্ত সাহরি খাওয়া যায়। তাহলে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আমার বাসার পাশের ৪-৫ টা মজিদের আজান আমি শুনতে পাই। কোন মুয়াজ্জিনের আজান দিতে ২ মিনিট লাগে। কারো ৩ মিনিট। কারো ৪ মিনিট। আমি কোন্ মসজিদের আযান শেষ হলে খাওয়া শেষ করব? উত্তরটা কি এমন হবে যে, সর্বশেষ আযান শেষ হবার আগ পর্যন্ত খেতেই থাকব? কোন মসজিদে সাহরি শেষ হবার ১০ মিনিট পর আযান দিলে তাহলে কি আমার টার্গেট এই মসজিদের আযানই হবে? নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন লজিকটা কতখানি দূর্বল!!!

সাহরি ও ইফতারের সঠিক সময় না জেনে সাহরির সময় শেষে বা ইফতারের সময়ের আগেই ইফতার করলে রোজা শুদ্ধ হবে না। পুণরায় তা আদায় করতে হবে। আপনার জেলার স্থানীয় সময় খুব সহজে জানতে পারবেন আমাদের ডেভেলপ করা একটি এন্ড্রয়েড এপের মাধ্যমে। জেলা অনুযায়ী সাহরি-ইফতারের সময়ের কাউন্ট ডাউন, এলার্ম, প্রয়োজনীয় দোয়া-দরূদ, কুরআন-হাদীসের অর্থ সহ বিষয় ভিত্তিক আর্টিকেল ও মাসআলা রয়েছে এই এপে। এছাড়াও রয়েছে প্রতিদিন একটি করে হাদীসের নোটিফিকেশন যার জন্য কোন ইন্টারনেট বা মোবাইল ব্যালেন্স খরচের ভয় নেই! এপের দারুণ একটি ফিচার হচ্ছে ডিজিটাল তসবীহ! যুক্ত আছে রমজানের খাদ্যাভ্যাসের উপর বেশ কিছু উপকারী লেখা। চমৎকার এই এপটি গুগল প্লে স্টোর থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এই লেখাটির উপর।
 

ইফতারের সময় কখন? ইফতারের জন্য এলাকার মসজিদে মাগরিবের আজান শোনা কি জরুরি?

রোজার সময় সীমা বা সাহরির শেষ ও ইফতারের শুরু বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ

আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায় (অর্থাৎ সুবহে সাদিক উদিত হয়)। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।

সূরা বাক্বারা, আয়াত ১৮৭

আল্লাহ তায়ালা এখানে বলেছেন রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করার জন্য। কিন্তু সেই রাতের ব্যাখ্যা এখানে দেন নাই। এই রাত বলতে কি রাতের শুরু, নাকি বেলা ডুবার ১ ঘন্টা পরের রাত নাকি মধ্য রাত নাকি পর দিনের শেষ রাত তা এই আয়াত থেকে জানা যায় না। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের (সা) এর হাদীস দ্বারা, সাহাবীদের (রা) আমল দ্বারা এটা সুস্পষ্ট যে এখানে রাত পর্যন্ত রোজা রাখা বলতে সূর্যাস্তকে বুঝানো হয়েছে।

আমাদের দেশে শিয়া সম্প্রদায়ের অপতৎপরতা খুব ভয়াবহ। অসংখ্য মুসলিমদেরকে তারা ঈমানহারা করে তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে ছলে-বলে-কৌশলে। এই শিয়া ধর্মের লোকেরা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করে। তারা উপরের কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা হাদীসের থেকে নেন না। তারা সাহরি করেন ভোর পর্যন্ত আর ইফতার করেন সূর্য ডোবার পর চারদিক পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেলে তারপর। তারা দলীল দেন এই আয়াত দিয়ে যে এখানে রাত পর্যন্ত রোজা রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু রাসূল (সা) যে সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করতে বলেছেন সেটা তারা মানেন না। তাদের এই অপতৎপরতাগুলো মুসলিম সমাজের মাঝে প্রচলিত আছে। পাঠকরা যদি দেখেন কেউ এই আয়াতের দলিল দিয়ে আপনাকে সূর্যাস্তের অনেক পরে গিয়ে ইফতার করতে বলছেন তাহলে নিঃসন্দেহে জেনে রাখুন ঐ লোক শিয়া ধর্মের অনুসারী। যথেষ্ট ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন না হলে তাদের দ্বারা বিভ্রান্ত ও ইমান হারা হওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। আল্লাহ এই লোকদের হাত থেকে আমাদের ঈমান-আমল হেফাজত করুন।

ইফতার শুরু হয় সূর্যাস্তের মাধ্যমে। আর মাগরিবের নামাজের ওয়াক্ত শুরুও হয় সূর্যাস্তের পরে। মাগরিবের নামাজের সময় যেহেতু সংক্ষিপ্ত তাই সাধারনত সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই আজান দেয়া হয়ে থাকে। অন্যান্য সময় ৪-৫ মিনিট দেরি হলেও রোজার সময় সূর্যাস্তের সাথে সাথেই আজান দেয়া হয়। কেননা আমরা আযান শুনেই ইফতার করতে অভ্যস্ত বা ইফতারের শুরুর সময় ও মাগরিবের শুরুর সময় একই।

অনেক জায়গায় দেখি নিজ এলাকার বাইরের কোন মসজিদের আজান শোনা যাচ্ছে অর্থাৎ সূর্য ডুবে গেছে (বা ইফতারের সময় হয়ে গেছে) কিন্তু রোজাদাররা নিজ এলাকার মসজিদের আজান শোনার অপেক্ষায় ইফতার শুরু করছেন না। আসলে এর দরকার নাই। কেননা একই দেশের পাশাপাশি দুই মহল্লার মধ্যে সূর্যাস্তের সময় একই হয়ে থাকে। কোন মসজিদের মুয়াজ্জিন সাহেবের হয়ত কোন কারণে আজান দিতে দেরি হতে পারে।

আবার দেখা যায় রেডিও বা টিভিতে মাগরিবের আজান প্রচারিত হচ্ছে কিন্তু রোজাদারেরা ইফতার করছে না। প্রায় সব টিভি বা রেডিওতেই ঢাকার স্থানীয় সময়ের উপর ভিত্তি করে আজান প্রচারিত হয়ে থাকে। তাই ঢাকার বাসিন্দারা রেডিও-টেলিভিশনের আযান শুনে ইফতার করলে কোন সমস্যা নাই।

অনেকে মনে করতে পারেন যে রেডিও-টিভিতে আগে ভাগে আযান দেয়। মসজিদে দেরিতে দেয়। দেরি করে ইফতার করাটাই সেফ। কিন্তু ঘটনা অন্য রকম। মুয়াজ্জিন সাহেবরা সাধারণত রেডিওর আজান শুনে আগে পানি পান করে বা একটা খেজুর খেয়ে ইফতার করেন এবং এরপর আজান দিয়ে থাকেন। লক্ষ্য করে দেখুন, হুজুরই কিন্তু রেডিওর সময়টা ফলো করছেন। কারণ সেটা ভুল হবার আশংকা খুবই কম। টেলিভিশন-রেডিওর আজান আর মসজিদের আজানের মধ্যে কিছু সময়ের পার্থক্য হয়। তবে সেই পার্থক্যটা আধা মিনিটের বেশি না। আর পার্থক্যটা হয়ে থাকে মূলত মুয়াযজ্জিন সাহেবের পানি মুখে দেয়ার কারণেই।

বাড়তি সতর্কতার জন্য আমরা ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে ইফতার করতে পারি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ক্যালেন্ডারে সাধারণত সূর্যাস্তের ৩ মিনিট পরে ইফতারের সময় দেয়া থাকে। তবে আপনি যদি মনে করেন সতর্কতামূলক সময়ের আগেই সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করবেন তাহলে নিজ দায়িত্বে সেটা করতে পারেন। এই প্যারা লিখার উদ্দেশ্য হল আমরা যেন কোন ভুল ধারণা নিয়ে পরে ইফতার না করি। পরে ইফতার করলে যেন সেটা হয় বাড়তি সতর্কতার জন্য, বাড়াবাড়ি যেন না হয়। কারণ ইফতারের সময় হয়ে গিয়েছে মনে করে ইফতার করা হল কিন্তু আসলে ইফতারের সময় হয় নাই, তাহলেও রোজাটি নষ্ট হয়ে যাবে। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে ইফতারের সময় হয়ে গেছে তাহলে উচিত ইফতার করে ফেলা। কারণ সময় হয়ে যাবার সাথে সাথেই ইফতার করা রাসূলের (সাঃ) সুন্নাহ।

এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। অনেক ভাইয়েরাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ৩ মিনিট সতর্কতামূলক সময়ের তীব্র বিরোধিতা করে একে সু্ন্নতে খেলাফ, বিদআত, ইহুদী-নাসারাদের অনুসরণকারী বলে থাকেন। তাদের প্রতি অনুরোধ একটু বড় আকারে চিন্তা করার। সাভার উপজেলা ঢাকার মধ্যে পড়ে। আবার ডেমরাও ঢাকার মধ্যে পড়ে। এই দুই জায়গার মধ্যে ৩০-৪০ কিলোমিটারের পার্থক্য। এই দূরত্বের পার্থক্যের জন্য সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পার্থক্য ২-৩ মিনিট হতে পারে। কম বা বেশি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষে কি সম্ভব সকল উপজেলার জন্য ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা? তার তারা গড়ে তিন মিনিট সময়ের পার্থক্য রেখে থাকে যেন জেলার সব জায়গায় এটা ফলো করা যায়। কিন্তু বর্তমানে অনেক অ্যাপ আছে যেগুলোর মাধ্যমে আপনি এক্সাক্ট কোনো একটা জায়গার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় বের করতে পারবেন। যেমন আমাদের ডেভেলপ করা Muslims Day App এর মাধ্যমে GPS location ব্যবহার করে আপনার বাড়ির সাপেক্ষে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময় দেখতে পারবেন। এক্ষেত্রে ইসলামি ফাউন্ডেশনের সতর্কতামূলক সময় অনুসরণের প্রয়োজন নাই।

সাহরি ও ইফতার দুটি ইবাদত। তাই আমাদের উচিত এই ইবাদতের উপর আমল করা। সাহরির খাবার অত্যন্ত বরকতপূর্ণ। এর থেকে বঞ্চিত হওয়া অনুচিত। ঘুম থেকে উঠে যদি দেখা যায় ১-২ মিনিট সময় বাকি আছে তাহলে অন্তত এক গ্লাস পানি হলেও পান করা শ্রেয়। কিন্তু সময় না থাকলে ঐ অবস্থাতেই না খেয়ে রোজা রাখতে হবে। এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সাহরি না খেলে রোজা শুদ্ধ হবে না। রমজান ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে বাড়িতে খাবারের ব্যবস্থা না থাকলে রাসূল (সাঃ) প্রায়ই না খেয়ে ঐ দিনটি রোজা রেখে কাটাতেন।

[এটা কোন মৌলিক লেখা নয়, আর আমিও ইসলামের কোন পন্ডিত ব্যক্তি নই। আমি বিভিন্ন রিসোর্স থেকে কিছু তথ্য একত্রে লিখেছি মাত্র। কোথাও কোন ভুল পরিলক্ষিত হলে অনুগ্রহ করে জানাবেন। আমি ঠিক করে দিব। দীর্ঘ লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। এতে হয়ত তার কিছু কনসেপ্ট ক্লিয়ার হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যান দান করুন]

20 thoughts on “সাহরি ও ইফতারের সময়ঃ প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

  1. এখানে ইফতারের সময় নিয়ে যেটা বলা হয়েছে সেটা স্পষ্টত ভুল। সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করার জন্য রাসূল স. বারবার তাগিদ দিয়েছেন। আর সতর্কতামূলক ৪/৫ মিনিট দেরি করা ঠিক নয়, সেটা ইহুদি নাসারাদের কাজ। রাসূল স. সহিহ বুখারীতে বলেছেন, আমার উম্মতগণ ততদিন কল্যাণের উপর থাকবে যতদিন তারা তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। তাই বিজ্ঞানের এই যুগে আজানের জন্য অপেক্ষা নয়, বরং সূর্যাস্তের সময় অনুযায়ী সাথে সাথে ইফতার করাই অধিক মঙ্গলকর। বিষয়টি ক্রস চেক করে নিবেন ইনশাল্লাহ।

    1. সতর্কতামূলক ৪/৫ মিনিট দেরি করে ইফতার করার কথা বলা হয় নাই এখানে। বলা হয়েছে রমজান ছাড়া অন্য সময় হয়ত আজান দেয়ার ক্ষেত্রে ৪/৫ মিনিট দেরি হতে পারে মসজিদে। যেটা ফজরের আজানের ক্ষেত্রেও হয়। হাদীসে ইহুদী-নাসারাদের দেরী করে ইফতার করার কথা পাওয়া যায়। সেটা ৪/৫ মিনিট দেরি কিনা আমার জানা নাই। শিয়ারা আরো দেরি করে ইফতার করে। আকাশ পুরোপুরি কালো হয়ে যাবার পর। সতর্কতামূলক সময় হিসাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩ মিনিট সময়ের হ্রাস-বৃদ্ধি করে থাকে। সেটা যুক্ত করে দিয়েছি। আপনার এ বিষয়ে আপত্তি থাকলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাথে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। ধন্যবাদ।

  2. সেহরি খাওয়া ছাড়া কি রোজা হবে? অর্থাৎ কিছু না খেয়ে নিয়ত করে রোজা রাখলেই কি ফরজ রোজা পালন হয়ে যাবে? দয়া করে কেউ জানাবেন।

    1. আর্টিকেলের শেষ প্যারায় এটা নিয়ে ছোট্ট করে বলা হয়েছে। রোজা রাখার জন্য সাহরি খাওয়া ফরজ বা ওয়াজিব নয়। সাহরি খাওয়া সুন্নাহ। রাসূল (সা) সাহরি খাওয়ার জন্য স্ট্রংলি রিকমেন্ড করেছেন। নফল রোজা রাসূল (সা) কিছু না খেয়েও রেখেছেন। নিয়তের ব্যাপারে আমার ব্লগের এই লেখাটি পড়তে পারেন

  3. গতরাতে টেরপাইনি,আযান দেয়া অবস্থায় ঘুম ভেঙেছে, দুটো খেজুর খেয়ে পানি খেয়েছি, রোযা কি হবে?

    1. আমি ২-৩ টি প্যারার মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করেছি যে আযানের সাথে সাহরি খাওয়ার সময়ের কোনো সম্পর্ক নাই। সাহরি খাওয়া যাবে সুবহে সাদিক হবার আগ পর্যন্ত। আর সুবহে সাদিকের সময় থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। সুবহে সাদিক শুরু হবার সময় থেকে সূর্য ওঠা শুরু হবার (অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্ত শেষ হবার) আগ পর্যন্ত যে কোনো সময়েই আজান হতে পারে। আমাদের দেশে সাহরির সময় শেষ হয়ে যাবার ৬-১০ মিনিট পর আজান দেয়া হয়। সে হিসাব মতে আপনি সে রাতে সাহরির সময় শেষ হবারও ৬-১০ মিনিট পর পানাহার করেছেন। তাই আপনার রোজাটি শুদ্ধ হবার কথা নয়। রমজানের পর এটার কাজা আদায় করে নিতে হবে।
      ধন্যবাদ

  4. ইফতারের সময় কুরআন ও হাদিস মতে বলবেন কি?

    1. কুরআনে বলা হয়েছে “রাত পর্যন্ত রোজা রাখ”। হাদীসের বা সাহাবাদের আমল দ্বারা এর explanation পাওয়া যায়। তা হচ্ছে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে। তবে শিয়া ধর্মের অনুসারীরা হাদীস বা সাহাবাদের এই আমলের অনুসরণ করেন না। তারা চারিদিক পুরোপুরি অন্ধকার না হলে ইফতার করেন না। এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন এখান থেকে

  5. না জানার কারনে আমি আগে আজানের সময় পর্যন্ত সাহরি খেয়েছি। সেই রোজা গুলা কি কাজা আদায় করতে হবে?

    1. আপু, এটা আমি নিশ্চিত নই। রোজার পরিমাণ কম হলে রমাদানের পর কাজা আদায় করে নেয়াটাই সম্ভবত সেফ সাইডে থাকা হবে। আর আগের বছরগুলোতেও এরকম হিসাব না থাকলে কী করতে হবে আমি ঠিক বলতে পারছি না। কোনো মুফতী সাহেবের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ফতোয়া জেনে নিতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *