পোস্টটি পড়া হয়েছে 2,712 বার
সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাডমিন্টরন খেলা কি জায়েজ?

সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাডমিন্টন খেলা বা ব্যক্তিগত কাজ করা কি জায়েজ?

শীত মৌসুমে আমাদের দেশে ব্যাডমিন্টন খেলার প্রচলন রয়েছে। যদি এই খেলা শরীয়তের অন্যান্য নীতিমালা লঙ্ঘন না করে (যেমন সতর খোলা, জুয়া, সালাতের ব্যাপারে বেখেয়াল ইত্যাদি) এবং নিছক শারীরিক কসরত বা শরীর চর্চার উদ্দেশ্যে হয় তাহলে ইনশাআল্লাহ এটা জায়েজ হবে।

কিন্তু যারা রাতের বেলা লাইট জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলেন, তাদের ক্ষেত্রে একটি ভয়ংকর গুনাহের আশংকা রয়েছে। আজকে এ বিষয়ে আমরা কিছু আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

সন্ধ্যার পর যখন ব্যাডমিন্টন খেলা হয় তখন বেশির ভাগ সময়েই মেইন লাইন তথা সরকারি লাইনের থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে হাই ভোল্টেজের লাইট জ্বালানো হয়। অনুমোদনহীন এই বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য সরকারের খরচ হয় হাজার হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ। যা জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ।

এরকম অবৈধ আর অনিরাপদ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে, গত ২০২০ সালের শীত মৌসুমে একটি দুর্ঘটনায় আমার বাসার পাশে প্রায় ৪০ টি বাসার ল্যাপটপ, টিভি, ফ্রিজ সহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি জ্বলে গিয়েছিল।

প্রশ্ন হচ্ছেঃ

সরকারি লাইনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কেউ ব্যাডমিন্টন খেললে, আলোকসজ্জা করলে বা অন্য কোনো কাজ করলে সেটা জায়েজ আছে কিনা?

উত্তর হলোঃ

এটা পুরোপুরি নাজায়েজ ও হারাম একটি কাজ। কারণ এটা রাষ্ট্রের বা পুরো জাতির সম্পদ। এই সম্পদ অন্যায় ভাবে ব্যবহার করা কোনো ক্রমেই জায়েজ হবে না। এর সাথে সারা দেশের মানুষের হক্ব জড়িত।

কোনো একজন ব্যক্তির থেকে কোনো সম্পদ অন্যায় ভাবে আত্মসাৎ করলে, ঐ ব্যক্তি যদি কখনো মাফ করে দেয় তাহলে আল্লাহ ঐ আত্মসাৎকারীকে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু দেশের বা জাতীয় সম্পদ যদি কেউ জবরদখল করে বা আত্মসাৎ করে তাহলে পুরো দেশবাসীর কাছেই অপরাধী হয়ে থাকতে হবে। এটা অসম্ভব যে দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যেক অপরাধীকে ক্ষমা করে দিবেন। তাই কিয়ামতের দিন পুরো দেশবাসীই ঐ আত্মসাৎকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করবেন।

তাই বান্দার হক্বের ব্যাপারে আমাদের যেমন সচেতন হতে হবে, একই রকম ভাবে আমরা দেশের বা সমাজের কোনো সম্পদ অন্যায় ভাবে ব্যবহার করছি কিনা সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। যারা সরকারি রাস্তা, সরকারি গাছ, সরকারি জমি ইত্যাদি; ছলে, বলে, কৌশলে ভোগ-দখল করেন; কিয়ামতের দিন তাদেরকে কত কোটি মানুষের মুখোমুখি হতে হবে তা চিন্তা করা যায় কি?

তাই আসুন, ব্যাডমিন্টন খেলা বা এরকম কোনো প্রয়োজনে আমরা নিজেদের বাসা-বাড়ি থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করি। অন্যের বাসা বা দোকান থেকে সংযোগ নিলে তাদেরকে পেমেন্ট করি। অনুরোধ করে আবদার করে হলেও তাদের অনুমতি ক্রমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। অন্যথায় লক্ষ-কোটি মানুষের দাবীর নিচে আমাদেরকে থাকতে হবে। কিয়ামতের দিন নিজেদের নেক আমলগুলো ঐসকল দাবীদারকে দিয়ে দিতে হবে।

সরকারি বিদ্যুতের ব্যক্তিগত ব্যবহার নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করার পর কিছু নেতিবাচক মন্তব্য পেয়েছি। যার দুই-একটি নিম্নরূপঃ

  1. সরকার যে জনগনের উপর কত জুলুম করছে আপনারা তো সেগুলা নিয়া বলেন না! আসছেন সরকারের দালালী করতে!
  2. সরকারের সম্পদ আমাদের ট্যাক্সের টাকা। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। সেগুলো আমরা খরচ করছি। এতে সমস্যা কী?

একেবারে অন্তঃসার শূণ্য, অবিবেচক ও বোকার মত প্রশ্ন!

প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছেঃ দুনিয়ার কোনো মানুষের কবরে সে ব্যতীত অন্য কেউ যাবে না। কোনো দেশের সরকার বা দেশের সকল লোক যদি অন্যায় করে বা জুলুম করে। তাহলে যারা যারা এই কাজটি করছেন তারা সেজন্য শাস্তির সম্মুখীন হবেন। তাদের পাপের জন্য আমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। দেশের সকল মানুষ যদি কোনো একটা পাপ করে। আর আমিও ঐ পাপটি করি। কিয়ামতের দিন কি আল্লাহকে বলতে পারব “সবাই করেছে তাই আমিও করেছি?” সবাই পাপ করলে কি আমার পাপ করা জায়েজ হয়ে যায়? সবাই চুরি করলে কি আমার চুরি করা আর অপরাধের পর্যায়ে থাকবে না?

সরকার তো কোনো সিঙ্গেল পারসন না। অনেকগুলো মানুষ মিলে সরকার গঠন করে। এর মধ্যে যারাই জালিম হবে তাদের সবাইকেই কিয়ামতের মাঠে কৈফিয়ত দিতে হবে। এরা জনগনের উপর জুলুম করলে জনগণকে কিয়ামতের দিন সওয়াব দিয়ে দিতে হবে। সওয়াব শেষ হয়ে গেলে গুনাহের বোঝা বইতে হবে। এটা আমাদের সবার জন্যই সমান। সরকারী লোক হই বা আম জনতা হই। ততটুকু পাপই করা উচিত, যতটুকুর শাস্তি ভোগ করতে আমরা রাজি আছি। আল্লাহ মাফ করে দিন।

দ্বিতীয় প্রশ্নের মত অযৌক্তিক কথা নিয়ে সময় নষ্ট করব কিনা চিন্তা করছিলাম।

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আমাদের ট্যাক্সের টাকায় উৎপাদিত বিদ্যুত আমরা ইচ্ছা মত খরচ করতে পারি। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে কার ট্যাক্সের কত টাকায় কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তা কিভাবে জানব? আমি ট্যাক্স দিলাম ১০ হাজার টাকা। আপনি ট্যাক্স দিলেন ১০ লাখ টাকা। আপনি কত টাকার বিদ্যুত ব্যক্তিগত কাজে খরচ করবেন আর আমি কত খরচ করব? এটার হিসাব কিভাবে হবে?

আমার ট্যাক্সের টাকা যখন সরকারকে দিলাম সেটার মালিক তো সরকার। অন্যের মালিকানার সম্পদ কি আমি ভোগ করতে পারি?

যেই ভাই এই প্রশ্ন করেছেন সেই ভাই কি বাড়ির বিদ্যুৎ বিল দেন কিনা আমার জানতে ইচ্ছা হয়। ট্যাক্সের টাকায়ই তো বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়!

যাই হোক, যারা হালাল হারাম বেঁচে চলতে চান; তারা সকল বিষয়েই সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে থাকেন। আল্লাহ তাদেরকে হারাম থেকে বাঁচিয়েও দেন। আসুন আমরা মুমিন হই। একজন প্রকৃত মু’মিন অবশ্যই সুনাগরিক হয়ে থাকেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যান দান করুন। আমীন।

তথ্যসূত্র

লেখাটি সংকলন করা হয়েছে শায়খ আহমাদুল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ এর একটি ভিডিও থেকে।
ভিডিও লিংকঃ https://youtu.be/T1hEiOU2fow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *